বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬

সবশেষ

মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগ শুরু হলেও যেসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত বাকি!

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগপ্রক্রিয়া শুরুর ঘোষণা এসেছে। একই সঙ্গে ১০ হাজার কর্মীকে বিনা খরচে নেওয়ার বিষয়ে নীতিগত সম্মতি, ৩৩৮টি রিক্রুটিং ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ এবং মেডিকেল সেন্টারের তালিকা পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ সামনে এসেছে। তবে এসব সিদ্ধান্তের সুফল কর্মীদের কাছে পৌঁছাতে এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া, চূড়ান্ত নির্দেশনা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব নির্ধারণ।

সরকারের ঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, মালয়েশিয়ার তালিকাভুক্ত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো নিয়োগকর্তা খুঁজে চাকরির চাহিদাপত্র বা জব অর্ডার সংগ্রহ করতে পারবে। কর্মী নির্বাচন ও নিয়োগের কার্যক্রমের পাশাপাশি কলিং ভিসা, ই-ভিসা এবং অন্যান্য প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত প্রসেসিং বা সার্ভিস এজেন্সিগুলো সহায়তা করবে। এরপর বাংলাদেশের নিয়ম অনুযায়ী কর্মীদের জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি ) ছাড়পত্র নিতে হবে।

তবে নিয়োগ শুরুর ঘোষণা আর সব প্রক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে কার্যকর হওয়া এক বিষয় নয়। কর্মীদের অভিবাসন ব্যয়, জিরো-কস্ট সুবিধার আওতা, অনুমোদিত মেডিকেল সেন্টারের পূর্ণাঙ্গ তালিকা এবং এজেন্সিগুলোর কার্যক্রম পরিচালনার নিয়ম বাস্তবায়নের অগ্রগতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

১০ হাজার কর্মীর জিরো-কস্ট উদ্যোগ: নীতিগত সম্মতির পর কী
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে ঘোষণাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো, বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ অনুরোধে ১০ হাজার কর্মীকে সম্পূর্ণ বিনা খরচে নেওয়ার বিষয়ে মালয়েশিয়ার নীতিগত সম্মতি।

বিদেশে চাকরি পেতে বাংলাদেশি কর্মীদের বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অনেক ক্ষেত্রে ঋণ করে অভিবাসনের খরচ জোগাড় করতে হয় কর্মীদের। ফলে বিদেশে যাওয়ার পর আয় দিয়ে সেই ঋণ পরিশোধ করাও বড় চাপ হয়ে দাঁড়ায়। এ অবস্থায় জিরো-কস্ট উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে নির্বাচিত কর্মীদের আর্থিক বোঝা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে নীতিগত সম্মতির পর এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এই ১০ হাজার কর্মী কীভাবে নির্বাচিত হবেন, কোন খাতের চাকরিতে তাদের নিয়োগ দেওয়া হবে এবং বিনা খরচে যাওয়ার আওতায় ঠিক কোন কোন ব্যয় থাকবে।

ভিসা, মেডিকেল পরীক্ষা, যাতায়াত, প্রশিক্ষণ কিংবা অন্যান্য প্রশাসনিক খরচ কে বহন করবে, সেসব বিষয় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে কর্মী নির্বাচন কীভাবে হবে এবং কোন প্রতিষ্ঠান এই কার্যক্রম তদারক করবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা থাকাও জরুরি।

জিরো-কস্ট সুবিধার বিষয়ে নীতিগত সম্মতিকে তাই গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা গেলেও, বাস্তবে কর্মীরা কতটা ব্যয় ছাড়াই যেতে পারবেন, তা নির্ভর করবে চূড়ান্ত শর্ত ও বাস্তবায়নব্যবস্থার ওপর।

মেডিকেল সেন্টারের পূর্ণাঙ্গ তালিকা এখনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য অনুমোদিত মেডিকেল সেন্টারের তালিকা চূড়ান্ত করাও শ্রমবাজার চালুর প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ।

সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মালয়েশিয়ার অনুমোদিত বিদ্যমান তালিকা থেকে বিতর্কিত ও অনিয়মের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মেডিকেল সেন্টারগুলো বাদ দিয়ে অবশিষ্ট কেন্দ্রগুলোর মাধ্যমে কার্যক্রম শুরুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন নীতিমালার আলোকে কেন্দ্রগুলো পুনরায় যাচাই-বাছাই করে পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির উদ্যোগ রয়েছে।

এ জন্য মালয়েশিয়ার স্বাস্থ্য, মানবসম্পদ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যৌথ প্রতিনিধি দলের বাংলাদেশে এসে মেডিকেল সেন্টারগুলো পরিদর্শনের কথা রয়েছে। পরিদর্শন ও যাচাই-বাছাই শেষে নতুন করে অনুমোদিত কেন্দ্রের তালিকা নির্ধারণ করা হবে।

সরকার জানিয়েছে, কোনো একটি নির্দিষ্ট মেডিকেল সেন্টারকে এককভাবে সব কর্মীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হবে না। অনুমোদিত কেন্দ্রগুলোর মাধ্যমে স্বাস্থ্য পরীক্ষা পরিচালনা এবং অনিয়ম পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।

তবে কর্মীদের জন্য কোন কোন কেন্দ্র কার্যকরভাবে অনুমোদিত থাকবে, স্বাস্থ্য পরীক্ষার ফি কত হবে এবং কেন্দ্র বাছাইয়ের নিয়ম কী হবে সে বিষয়ে হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ জরুরি। কারণ চূড়ান্ত তালিকা ও ফি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না থাকলে কর্মীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।

৩৩৮ প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ, দায়িত্ব বণ্টনও গুরুত্বপূর্ণ
নতুন নিয়োগ কাঠামোয় মোট ৩৩৮টি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণের বিষয়ে মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ সম্মত হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে একটি সরকারি রিক্রুটিং এজেন্সি বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল), ২৫টি মূল রিক্রুটিং এজেন্সি এবং ৩১২টি সহযোগী রিক্রুটিং এজেন্সি।

এই কাঠামোয় তালিকাভুক্ত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো নিজেদের উদ্যোগে মালয়েশিয়ার নিয়োগকর্তা খুঁজে জব অর্ডার সংগ্রহ এবং কর্মী নির্বাচন করতে পারবে। অন্যদিকে, বোয়েসেলসহ নির্ধারিত প্রসেসিং বা সার্ভিস এজেন্সিগুলো কলিং ভিসা, ই-ভিসা এবং অন্যান্য প্রশাসনিক কার্যক্রমে সহায়তা করবে।

কর্মী নির্বাচন ও নিয়োগের দায়িত্ব এবং প্রশাসনিক প্রসেসিংয়ের দায়িত্ব পৃথক রাখার মাধ্যমে একটি সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো নিজস্ব লাইসেন্সের অধীনে কর্মীদের বিএমইটি ছাড়পত্রের কার্যক্রমও সম্পন্ন করতে পারবে বলে জানানো হয়েছে।

তবে এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ভর করবে প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব কতটা স্পষ্টভাবে নির্ধারিত হচ্ছে তার ওপর। বিশেষ করে সহযোগী এজেন্সিগুলোর ভূমিকা, জব অর্ডার সংগ্রহের নিয়ম, প্রসেসিংয়ের শর্ত এবং প্রতিটি ধাপে জবাবদিহির বিষয়গুলো পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।

এজেন্সির সংখ্যা বাড়লেই কর্মীদের জন্য নিয়োগপ্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে সহজ বা সাশ্রয়ী হয়ে যাবে না। এজন্য নিয়োগের শর্ত, ফি, চুক্তি এবং কর্মী নির্বাচনের নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা তদারকির ব্যবস্থাও কার্যকর হতে হবে।

নিয়োগকর্তা খোঁজা থেকে বিএমইটি ছাড়পত্র: বাস্তবায়নের ধাপ
ঘোষিত ব্যবস্থায় কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়াটি কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হওয়ার কথা। প্রথমে তালিকাভুক্ত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো মালয়েশিয়ার নিয়োগকর্তাদের কাছ থেকে চাকরির চাহিদাপত্র সংগ্রহ করবে। এরপর চাহিদা অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রচলিত আইন ও বিধি মেনে কর্মী নির্বাচন করা হবে।

পরবর্তী ধাপে কলিং ভিসা, ই-ভিসা এবং মালয়েশিয়ার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। এ পর্যায়ে নির্ধারিত প্রসেসিং বা সার্ভিস এজেন্সিগুলো সহায়তা দেবে। সবশেষে বাংলাদেশের নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও বিএমইটি ছাড়পত্রের কার্যক্রম শেষ করতে হবে।

প্রতিটি ধাপে কী কী নথি লাগবে, কত সময় প্রয়োজন হবে এবং কর্মীদের কোন পর্যায়ে কত অর্থ দিতে হবে সে বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা থাকলে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিশ্চয়তা কমতে পারে। একই সঙ্গে চাকরির চাহিদাপত্রের সত্যতা যাচাই এবং কর্মীদের সঙ্গে নিয়োগের শর্ত স্বচ্ছভাবে নির্ধারণ করাও জরুরি।

শ্রমবাজার চালুর পর নজর জবাবদিহি ও কর্মীদের সুরক্ষায়
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর উদ্যোগের সাফল্য শুধু কতজন কর্মী পাঠানো গেল, তা দিয়ে নির্ধারিত হবে না। কর্মীরা কতটা সাশ্রয়ী ব্যয়ে যেতে পারলেন, নিয়োগের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী চাকরি পেলেন কি না এবং পুরো প্রক্রিয়ায় প্রতারণা বা অনিয়ম থেকে কতটা সুরক্ষা পেলেন এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।

সরকার রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে দেশের আইন মেনে নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা এবং কর্মীদের স্বার্থ রক্ষার আহ্বান জানিয়েছে। এ ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, ভুয়া জব অর্ডার, চাকরির শর্ত গোপন রাখা কিংবা অনুমোদনহীন মেডিকেল সেন্টারের মাধ্যমে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানোর মতো ঝুঁকি প্রতিরোধে কার্যকর তদারকি প্রয়োজন।

একই সঙ্গে কর্মীদেরও নিয়োগকর্তা, চাকরির শর্ত, এজেন্সির বৈধতা, অনুমোদিত মেডিকেল সেন্টার এবং সরকারি ফি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।

ঘোষণার সুফল পেতে প্রয়োজন দ্রুত ও স্পষ্ট বাস্তবায়ন
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার চালুর ঘোষণা, ১০ হাজার কর্মীকে জিরো-কস্টে নেওয়ার নীতিগত সম্মতি এবং ৩৩৮টি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ মিলিয়ে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কিন্তু এই সম্ভাবনা বাস্তব কর্মসংস্থানে রূপ দিতে হলে সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

জিরো-কস্ট কর্মসূচির চূড়ান্ত শর্ত, অনুমোদিত মেডিকেল সেন্টারের পূর্ণাঙ্গ তালিকা, রিক্রুটিং ও প্রসেসিং এজেন্সির দায়িত্ব এবং নিয়োগের প্রতিটি ধাপের নিয়ম স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা প্রয়োজন। এসব বিষয়ে পরিষ্কার নির্দেশনা থাকলে কর্মী, নিয়োগকর্তা ও রিক্রুটিং প্রতিষ্ঠান প্রক্রিয়াটি সম্পর্কে নিশ্চিত ধারণা পাবে।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান শক্তিশালী করতে তাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ঘোষণাগুলোকে বাস্তব সুযোগে রূপ দেওয়া। স্বচ্ছ নিয়োগ, নিয়ন্ত্রিত অভিবাসন ব্যয় এবং কর্মীদের অধিকার সুরক্ষার নিশ্চয়তা থাকলেই এই উদ্যোগের সুফল দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *