যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। একসময় রিপাবলিকানদের নিরাপদ নির্বাচনী এলাকা হিসেবে পরিচিত একাধিক অঙ্গরাজ্যে জয় পেয়ে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেয়েছে ডেমোক্রেটিক পার্টি। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের মাঝপথে এই ফলাফল তার প্রশাসনের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে প্রতিনিধি পরিষদেও ডেমোক্র্যাটদের অগ্রগতির ইঙ্গিত মিলছে। ফলে আগামী বছর থেকে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কায় পড়তে পারে রিপাবলিকান পার্টি।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ ক্যারোলাইনা, নর্থ ক্যারোলাইনা, ওহাইও, টেক্সাস, আইওয়া ও কানসাসে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের জয় বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। এসব অঙ্গরাজ্যের কয়েকটিতে কয়েক দশক ধরে সিনেট নির্বাচনে জিততে পারেনি দলটি। এবার সেই দীর্ঘদিনের নির্বাচনী হিসাব পাল্টে গেছে।
২০২২ সালের পর প্রথমবারের মতো কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সুযোগও তৈরি হয়েছে ডেমোক্র্যাটদের সামনে। প্রতিনিধি পরিষদের নির্বাচনেও দলটির জয়ের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। এমনটি হলে ট্রাম্পের মেয়াদের বাকি সময়ে আইন প্রণয়ন, নীতিনির্ধারণ এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে রিপাবলিকান প্রশাসনকে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে আরও বেশি সমঝোতা করতে হতে পারে।
তবে সিনেটের কয়েকটি আসনে তখনো ভোট গণনা চলছিল। মিনেসোটা ও মিশিগানে অবসর নেওয়া ডেমোক্র্যাট সিনেটরদের আসন ধরে রাখার চেষ্টা করছিল দলটি। রিপাবলিকানদের শক্তিশালী ঘাঁটি মেইনেও ছিল হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। সেখানে ডেমোক্র্যাট-সমর্থিত অঙ্গরাজ্য থেকে নির্বাচিত একমাত্র রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্সের আসন ছিল আলোচনায়।
আলাস্কায় দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করা রিপাবলিকান সিনেটর ড্যান সুলিভানকেও হারানোর আশা করছিলেন ডেমোক্র্যাটরা। তবে ওই আসনের ফল জানতে কয়েক দিন অপেক্ষা করতে হতে পারে বলে জানানো হয়েছিল।
অন্যদিকে, ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পকে সমর্থন দেওয়া জর্জিয়া ও নিউ হ্যাম্পশায়ারে ডেমোক্র্যাটদের আসন দখলের পরিকল্পনা থাকলেও সফল হয়নি রিপাবলিকানরা।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে বদলে গেল নির্বাচনী হাওয়া
২০২৪ সালের নির্বাচনে হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তনের পর সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল ডেমোক্র্যাটরা। সে সময় ৫৩টি আসন পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করে রিপাবলিকানরা। তখন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা ছিল, দ্রুত এই নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়া ডেমোক্র্যাটদের জন্য কঠিন হবে।
এর পেছনে কয়েকটি কারণও ছিল। ২০২৬ সালের নির্বাচনে সিনেটের বেশির ভাগ আসনই ছিল দুই দলের ঐতিহ্যগত শক্ত ঘাঁটিতে। এ ছাড়া কংগ্রেস নির্বাচনে ভোটারদের একাধিক দলের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার প্রবণতাও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কমে এসেছিল।
কিন্তু ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু হওয়ার পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি ধীরে ধীরে পাল্টাতে থাকে। বিশেষ করে অর্থনীতি ও অভিবাসন নীতি নিয়ে তার জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়ে। অথচ এই দুটি ইস্যুই ছিল ট্রাম্পের রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার অন্যতম ভিত্তি।
ইরানে হামলার সিদ্ধান্ত এবং অভিবাসনবিরোধী অভিযানে ফেডারেল এজেন্টদের তৎপরতা প্রশাসনের বিরুদ্ধে অসন্তোষ বাড়ায়। মিনিয়াপোলিসে এসব অভিযানের সময় দুই মার্কিন নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনাও জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।
এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় ভোটারদের অর্থনৈতিক উদ্বেগ আরও বাড়ে। এই পরিস্থিতিতে টেক্সাস, কানসাস ও আইওয়ার মতো অঙ্গরাজ্যে জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা।
যেসব অঙ্গরাজ্যে কয়েক দশক পর ফিরল ডেমোক্র্যাটদের জয়
এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বার্তা এসেছে রিপাবলিকানদের দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটিগুলো থেকে।
কানসাসে সর্বশেষ ১৯৩২ সালে সিনেট নির্বাচনে জিতেছিল ডেমোক্র্যাটরা। টেক্সাসে দলটির সর্বশেষ জয় ছিল ১৯৮৮ সালে। দক্ষিণ ক্যারোলাইনায় সর্বশেষ জয় এসেছিল ৩৮ বছর আগে। অন্যদিকে আইওয়া ও নর্থ ক্যারোলাইনায় সর্বশেষ ডেমোক্র্যাট বিজয় ছিল ১৮ বছর আগে।
দীর্ঘ সময় ধরে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এসব অঙ্গরাজ্যে এবার ডেমোক্র্যাটদের জয় শুধু আসনসংখ্যার পরিবর্তন নয়, বরং ভোটারদের রাজনৈতিক মনোভাবের পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত দিচ্ছে।
নির্বাচনের শুরু থেকেই নর্থ ক্যারোলাইনা, ওহাইও, আলাস্কা ও মেইনের রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত আসনগুলোকে লক্ষ্য করেছিল ডেমোক্র্যাটরা। বিপরীতে জর্জিয়া, মিশিগান, নিউ হ্যাম্পশায়ার ও মিনেসোটায় ডেমোক্র্যাটদের আসন দখলের পরিকল্পনা করেছিল রিপাবলিকানরা। শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি আসনে ডেমোক্র্যাটদের সাফল্য নির্বাচনী চিত্র বদলে দেয়।
নিজ দলের মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ কি বুমেরাং হলো?
নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বিপর্যয়ের পেছনে ট্রাম্পের নিজের দলের প্রার্থী বাছাইয়ে হস্তক্ষেপও আলোচনায় এসেছে। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আসনে তার পছন্দের প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়ার সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত রিপাবলিকানদের জন্য নেতিবাচক ফল বয়ে এনেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
নর্থ ক্যারোলাইনায় রিপাবলিকান সিনেটর থম টিলিস একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বিলের বিরোধিতা করায় তার সমালোচনা করেছিলেন ট্রাম্প। এর পর টিলিস অবসরের ঘোষণা দেন। তার ছেড়ে দেওয়া আসনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ও সাবেক গভর্নর রয় কুপার জয় পান।
টেক্সাসেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়। দীর্ঘদিনের সিনেটর জন কর্নিনের পরিবর্তে অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটনকে সমর্থন দেন ট্রাম্প। বিভিন্ন কেলেঙ্কারির অভিযোগে সমালোচিত প্যাক্সটনের প্রতি ট্রাম্পের সমর্থনের পর দলীয় প্রাথমিক নির্বাচনে হেরে যান কর্নিন।
এতে টেক্সাসে ডেমোক্র্যাটদের সামনে জয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ও অঙ্গরাজ্যের প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য জেমস তালারিকো দুই অঙ্কের ব্যবধানে জয় পেয়েছেন বলে জানিয়েছে এপি।








