মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬

ট্রাম্পকে দুঃসংবাদ দিল মার্কিন গোয়েন্দারা

যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অত্যন্ত গোপনীয় প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক ও সামরিক মহলে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি মার্কিন ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স কাউন্সিল (এনআইসি) একটি মূল্যায়ন ধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যেখানে দাবি করা হয়েছে যে ইরানের বর্তমান ইসলামিক শাসনব্যবস্থাকে সমূলে উৎপাটন করা প্রায় অসম্ভব।

গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া অপারেশন এপিক ফিউরি নামক সামরিক অভিযানের ফলাফল বিশ্লেষণ করে গোয়েন্দারা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ রুবেন জনসন ওয়াশিংটন পোস্টের বরাতে এই সংবেদনশীল তথ্যের বিস্তারিত তুলে ধরেছেন যা বর্তমানে আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর আইআরজিসি এবং দেশটির ধর্মীয় নেতৃত্ব এমন এক সুসংগঠিত উত্তরাধিকার কাঠামো তৈরি করে রেখেছে যা সাধারণ কোনো বিমান হামলা বা সামরিক অভিযান দিয়ে ভেঙে ফেলা সম্ভব নয়। এমনকি যদি শীর্ষস্থানীয় নেতাদের ওপর সরাসরি হামলা চালানো হয়, তবুও তাদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং আর্থিক সক্ষমতা শাসনব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে যথেষ্ট ভূমিকা রাখবে। প্রতিবেদনের মূল নির্যাস হলো, একটি বড় মাপের সামরিক প্রচারণা চালিয়েও ইরানি মোল্লাতন্ত্র এবং তাদের প্রধান রক্ষাকবচ আইআরজিসিকে ক্ষমতাচ্যুত করা যাবে না বলে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মনে করছে।

এই গোয়েন্দা মূল্যায়নটি বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইরান সরকারকে সম্পূর্ণভাবে বদলে ফেলার প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়েছিলেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একটি সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, তিনি ইরানের বর্তমান ব্যবস্থার সংস্কার নয় বরং একে পুরোপুরি পরিষ্কার করে নতুন একটি সরকার গঠন করতে চান। তবে ট্রাম্পের এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার সাথে মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতার একটি বড় ফারাক রয়ে গেছে বলে এনআইসি-র প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে। গোয়েন্দারা আশঙ্কা করছেন, ইরানের ভেতরে একটি শক্তিশালী ও একক বিরোধী দলের অভাব এই পরিবর্তনের স্বপ্নকে আরও জটিল করে তুলছে।

সবচেয়ে কৌতূহলজনক বিষয় হলো পরবর্তী সম্ভাব্য নেতৃত্ব নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ব্যক্তিগত অবস্থান। দীর্ঘ সময় ধরে নির্বাসিত ক্রাউন প্রিন্স রেজা পাহলভির প্রতি ইরানের রাজপথের সাধারণ মানুষের কিছুটা সমর্থন পেলেও ট্রাম্প তাকে নিয়ে খুব একটা উৎসাহ দেখাচ্ছেন না। যদিও ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে ইরানের প্রতিটি বড় শহরের রাস্তায় রাস্তায় রাজতন্ত্রের পক্ষে স্লোগান শোনা গেছে এবং সাবেক ইম্পেরিয়াল পতাকায় ছেয়ে গেছে চারপাশ, তবুও মার্কিন প্রেসিডেন্ট মনে করছেন বাইরের কোনো নেতার চেয়ে ইরানের ভেতরে বর্তমানে অবস্থান করছেন এমন কাউকে দায়িত্ব দেওয়া বেশি সমীচীন হবে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এনবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইঙ্গিত দিয়েছেন, তার পছন্দের তালিকায় এমন কিছু ব্যক্তি আছেন যারা বর্তমানে ইরানের ভেতরেই কোনো না কোনোভাবে বর্তমান ব্যবস্থার সাথে সম্পৃক্ত। তিনি আরও দাবি করেছেন, এই ব্যক্তিদের জীবন রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র বিশেষ নজর রাখছে যাতে যুদ্ধের ময়দানে তাদের কোনো ক্ষতি না হয়। ট্রাম্পের এমন রহস্যময় মন্তব্য থেকে বোঝা যায় যে তিনি হয়তো ইরানের বর্তমান কাঠামোর ভেতর থেকেই কোনো একটি গ্রুপকে দিয়ে অভ্যুত্থান ঘটানোর পরিকল্পনা করছেন। তবে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মতে, এই ধরনের কোনো পরিকল্পনা সফল হওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।

সামরিক কৌশলবিদদের মতে, এনআইসি-র এই গোপন নথিতে মূলত দুটি প্রধান পরিস্থিতির কথা বলা হয়েছিল। প্রথমটি ছিল ইরানের শীর্ষ নেতাদের ওপর নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়ে নেতৃত্বশূন্য করা এবং দ্বিতীয়টি ছিল দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করা। প্রতিবেদনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির অবর্তমানে শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার জন্য দেশটির সামরিক ও ধর্মীয় নেতৃত্ব আগে থেকেই একটি বিশেষ পরিকল্পনা বা ‘ড্যামেজ কন্ট্রোল’ মেকানিজম তৈরি করে রেখেছে। এর ফলে নেতৃত্বের শূন্যতা তৈরি হলেও ক্ষমতা হারানো বা পুরো ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার ঝুঁকি নেই বললেই চলে।

এদিকে মার্কিন এবং ইসরায়েলি বিমান বাহিনী ইরানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় কয়েক দফা বড় হামলা চালালেও ইরানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনীগুলো এখনো আগের মতোই সক্রিয় রয়েছে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ রুবেন জনসন তার বিশ্লেষণে উল্লেখ করেছেন, ২০২৩ সাল থেকে শুরু হওয়া অপারেশন এপিক ফিউরির মাধ্যমে ইরানের অনেক ক্ষয়ক্ষতি হলেও আইআরজিসি-র মূল শক্তি এখনো অক্ষুণ্ণ রয়েছে। এই পরিস্থিতি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য একটি কৌশলগত দ্বিধা তৈরি করেছে, কারণ যে শাসন পরিবর্তন বা ‘রেজিম চেঞ্জ’-এর স্বপ্ন তারা দেখছিলেন, সেটি বর্তমান গোয়েন্দা তথ্যের আলোকে প্রায় অলীক মনে হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *