দক্ষিণ আমেরিকা থেকে ইউরোপগামী একটি প্রমোদতরী এমভি হন্ডিয়াসে হান্টাভাইরাসের একটি প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে বলে বিভিন্ন গবেষণা ও স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানানো হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি হলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কোনো বৈশ্বিক মহামারির ইঙ্গিত নয়, বরং সীমিত পরিসরের একটি সংক্রমণ পরিস্থিতি।
প্রাথমিক তথ্যমতে, জাহাজটিতে থাকা কয়েকজন যাত্রীর শরীরে হান্টাভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। এখন পর্যন্ত ছয়জন আক্রান্ত হয়েছেন বলে উল্লেখ করা হচ্ছে, যাদের মধ্যে তিনজনের মৃত্যুর খবরও এসেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানা যায়।
সাধারণভাবে হান্টাভাইরাস ইঁদুরের মল, মূত্র বা লালার মাধ্যমে ছড়ায় বলে পরিচিত। তবে গবেষকদের নতুন পর্যবেক্ষণে বলা হচ্ছে, “অ্যান্ডিস স্ট্রেইন” নামে পরিচিত একটি ধরনে মানুষের মধ্যে সংক্রমণের সম্ভাব্য পথ ভিন্ন হতে পারে।
গবেষণায় ধারণা দেওয়া হচ্ছে, আক্রান্ত ব্যক্তির লালার মাধ্যমে ভাইরাস ছড়াতে পারে। ফলে খুব ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ, যেমন চুম্বন, পানীয় ভাগ করে খাওয়া, অথবা কাছাকাছি অবস্থায় কাশি-হাঁচির মাধ্যমে সংক্রমণের ঝুঁকি থাকতে পারে। কিছু বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, যৌন সঙ্গীদের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ আমেরিকায় ভ্রমণের সময় দুইজন ডাচ পর্যটক ইঁদুরবাহিত সংক্রমণের সংস্পর্শে আসতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। পরে তাদের মাধ্যমে জাহাজে থাকা অন্য যাত্রীদের মধ্যে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এমভি হন্ডিয়াস নামের ওই জাহাজটি প্রায় ১৫০ জন যাত্রী নিয়ে যাত্রা করছিল বলে জানা যায়। যাত্রাপথে একজন যাত্রীর মৃত্যুর পর পরিস্থিতি আরও গুরুত্ব পায় এবং কিছু যাত্রী নির্দিষ্ট স্থানে নেমে যান। পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যাত্রীদের খুঁজে বের করা ও তাদের স্বাস্থ্যপরীক্ষার উদ্যোগ নেয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পরিস্থিতি নিয়ে সতর্কতা জারি করলেও এটিকে কোভিড-১৯ এর মতো বৈশ্বিক সংকট হিসেবে দেখার কোনো কারণ নেই বলে জানিয়েছে। সংস্থার সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ মারিয়া ভ্যন ক্যারকোহভ জানান, এটি একটি সীমিত পরিসরের প্রাদুর্ভাব, যা মূলত ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শের মাধ্যমে ছড়াচ্ছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, রোগী ও সন্দেহভাজনদের সংস্পর্শে থাকা ব্যক্তিদের মাস্ক ও সুরক্ষামূলক সরঞ্জাম ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সংক্রমিতদের আলাদা রাখার মাধ্যমে ছড়ানো নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব বলেও তিনি জানান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হান্টাভাইরাস সাধারণত খুব সহজে ছড়ায় না এবং এটি ইনফ্লুয়েঞ্জা বা করোনাভাইরাসের মতো দ্রুত বিস্তার ঘটায় না। সীমিত স্থান যেমন জাহাজ বা ঘনবসতিপূর্ণ পরিবেশে সংক্রমণ বেশি দেখা যেতে পারে, তবে এটি ভাইরাসের আচরণগত সীমাবদ্ধতার কারণে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্যার অ্যান্ড্রু পোলার্ডও মন্তব্য করেছেন যে, বর্তমান পরিস্থিতি কোনো মহামারির ইঙ্গিত দেয় না। বরং এটি একটি নিয়ন্ত্রিত প্রাদুর্ভাব, যা দ্রুত ব্যবস্থা নিলে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো নজরদারি ও অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে। যদিও সংক্রমণের খবর উদ্বেগ তৈরি করেছে, বিশেষজ্ঞদের মতে আতঙ্কিত হওয়ার মতো কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। বরং দ্রুত শনাক্তকরণ, সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা নিলে এই ধরনের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।








