শুক্রবার, ২৯ মে ২০২৬

সবশেষ

ইরানের যে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ট্রাম্পের আপত্তি, তার ভিত্তি গড়েছিল যুক্তরাষ্ট্রই!

বর্তমানে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের উদ্বেগ নতুন কিছু নয়। বিশেষ করে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময় থেকে তেহরানের পারমাণবিক কার্যক্রমকে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হিসেবে তুলে ধরা হয়। তবে ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, এই কর্মসূচির গোড়াপত্তনই হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্রদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায়।

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি শুরু হয়েছিল ইসলামি বিপ্লবের পর নয়, বরং শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির শাসনামলে। সে সময় ইরান ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র। মধ্যপ্রাচ্যে আধুনিক, শিল্পোন্নত ও পশ্চিমাপন্থী রাষ্ট্র গড়ে তুলতে শাহ যে পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিলেন, তার অন্যতম প্রধান অংশ ছিল পারমাণবিক প্রযুক্তির উন্নয়ন।

পঞ্চাশের দশকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘Atoms for Peace’ বা ‘শান্তির জন্য পরমাণু’ কর্মসূচির আওতায় তেহরানের সঙ্গে পারমাণবিক সহযোগিতা শুরু করে ওয়াশিংটন। সেই উদ্যোগের মাধ্যমেই ইরান প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক পারমাণবিক প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণের সুযোগ পায়।

এর ধারাবাহিকতায় ১৯৬৭ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে একটি গবেষণা রিঅ্যাক্টর সরবরাহ করে। শুধু আমেরিকাই নয়, সে সময় ব্রিটেন, ফ্রান্স, পশ্চিম জার্মানি, ইতালি এমনকি ইসরাইলের বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদরাও ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামো তৈরিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন।

শাহ পাহলভি বিশ্বাস করতেন, পারমাণবিক শক্তি শুধু জ্বালানির বিকল্প উৎস নয়; এটি একটি দেশের আধুনিকতা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক মর্যাদার প্রতীক। সেই ভাবনা থেকেই দক্ষিণাঞ্চলীয় বুশেহরে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ শুরু হয় জার্মান সহযোগিতায়।

এদিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নিজেকে দায়িত্বশীল রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরতে ১৯৭০ সালে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তাররোধ চুক্তি (এনপিটি) অনুমোদন করে ইরান। তখন পশ্চিমা বিশ্বও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে ইতিবাচকভাবেই দেখছিল।

কিন্তু ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব পুরো পরিস্থিতি বদলে দেয়। শাহ সরকারের পতনের পর আয়াতুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে নতুন ইসলামি সরকার ক্ষমতায় এলে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে তেহরানের সম্পর্ক দ্রুত অবনতি ঘটে। এর প্রভাব পড়ে পারমাণবিক প্রকল্পগুলোতেও।

বিপ্লবের পর পশ্চিমা বিশেষজ্ঞরা ইরান ত্যাগ করেন এবং বহু উন্নয়ন প্রকল্প বন্ধ হয়ে যায়। তবে এতদিনে গড়ে ওঠা অবকাঠামো, গবেষণা সুবিধা এবং প্রশিক্ষিত ইরানি বিজ্ঞানীরা থেকেই যান। ফলে কর্মসূচি পুরোপুরি থেমে যায়নি।

পরবর্তীতে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় বুশেহর পারমাণবিক প্রকল্প একাধিকবার হামলার শিকার হয়। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক চাপ ও নিষেধাজ্ঞার মুখে ইউরোপীয় দেশগুলো ইরান থেকে দূরে সরে গেলেও তেহরান বিকল্প অংশীদার খুঁজতে শুরু করে। ধীরে ধীরে রাশিয়া, চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে পারমাণবিক সহযোগিতা বাড়ায় দেশটি।

২০০২ সালে ইরানের নাতাঞ্জ ও আরাকের গোপন পারমাণবিক স্থাপনার তথ্য প্রকাশ্যে এলে বিশ্বজুড়ে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল অভিযোগ তোলে, ইরান শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির আড়ালে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করছে। যদিও তেহরান বরাবরই দাবি করে আসছে, তাদের পারমাণবিক কার্যক্রম সম্পূর্ণ বেসামরিক ও শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত।

বিশ্লেষকদের মতে, পুরো ঘটনাটির সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক বিদ্রূপ হলো, যে কর্মসূচিকে বর্তমানে ওয়াশিংটন ও তেল আবিব সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখছে, সেই কর্মসূচির ভিত্তি গড়ে তুলতে একসময় তারাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *