দেশের নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে যাচ্ছে না সরকার ও ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। সাংবিধানিক সময়সীমার মধ্যেই আগামী সেপ্টেম্বরে জাতীয় সংসদের পরবর্তী অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর আগে সংবিধান সংশোধনের অগ্রগতি এবং রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও দায়িত্বে সম্ভাব্য পরিবর্তন বিবেচনায় নিয়ে প্রার্থী চূড়ান্ত করবে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটি।
সরকার ও বিএনপির দায়িত্বশীল সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সংবিধানের অষ্টাদশ সংশোধনী বিল আগামী সেপ্টেম্বরে সংসদে উত্থাপনের প্রস্তুতি চলছে। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য এবং জুলাই জাতীয় সনদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ যুক্ত হতে পারে। এ কারণে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ভূমিকা কী হবে, সেটি স্পষ্ট হওয়ার পরই নির্বাচন আয়োজনকে বেশি যৌক্তিক মনে করা হচ্ছে।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতাদের মতে, রাষ্ট্রপতির বর্তমান আনুষ্ঠানিক ভূমিকার বাইরে যদি নতুন কোনো ক্ষমতা বা দায়িত্ব যুক্ত হয়, তাহলে প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রেও নতুন করে মূল্যায়নের প্রয়োজন হবে।
দলীয় প্রার্থী হিসেবে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী এবং বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে নিয়ে। দলের একটি অংশ তাকে রাষ্ট্রপতি পদে দেখতে সক্রিয় বলেও জানা গেছে। যদিও দল ও সরকারের উচ্চপর্যায়ে আরও কয়েকটি বিকল্প নামও বিবেচনায় রয়েছে।
গত শুক্রবার মো. সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর পর জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন। সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে। সংসদে বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলটির মনোনীত প্রার্থীর নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে শনিবার বগুড়ায় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, দলীয় নাকি বাইরের কাউকে প্রার্থী করা হবে, সেই সিদ্ধান্ত বিএনপির স্থায়ী কমিটি সংবিধান ও আইন অনুসরণ করে নেবে।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী সূত্রগুলোর ভাষ্য, এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মতামত গুরুত্বপূর্ণ হলেও আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে স্থায়ী কমিটির বৈঠকে।
মির্জা ফখরুলের পক্ষে যে বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে, তার মধ্যে রয়েছে এক যুগের বেশি সময় ধরে দলের মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দলকে সংগঠিত রাখা, তাঁর রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং দলীয় ও জাতীয় পর্যায়ে ইতিবাচক ভাবমূর্তি। অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুলসহ কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি প্রকাশ্যে তাকে রাষ্ট্রপতি পদে উপযুক্ত প্রার্থী হিসেবে মত দিয়েছেন।
তবে তাকে রাষ্ট্রপতি করা হলে বিএনপি ও সরকারের ভেতরে একাধিক পরিবর্তন আনতে হবে। সেক্ষেত্রে তাকে স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর দায়িত্ব ছাড়তে হবে, নতুন মহাসচিব নির্বাচন করতে হবে এবং সংবিধান অনুযায়ী ঠাকুরগাঁও-১ আসনও শূন্য হয়ে যাবে। সরকারের মেয়াদের শুরুতেই এসব পুনর্বিন্যাস করা হবে কি না, সেটিও সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মির্জা ফখরুলের পাশাপাশি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, আবদুল মঈন খান ও নজরুল ইসলাম খানের নামও আলোচনায় রয়েছে। বয়স, শারীরিক সক্ষমতা এবং দল ও সরকারের প্রয়োজন বিবেচনায় সম্ভাব্য প্রার্থীর তালিকা আগের তুলনায় সীমিত হয়েছে। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনকারী স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের নামও দলের কিছু পর্যায়ে আলোচিত হচ্ছে।
দলের বাইরের কাউকে রাষ্ট্রপতি করার বিকল্পও এখনও পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়নি। এ ক্ষেত্রে সাবেক একজন প্রধান বিচারপতির নাম আলোচনা এসেছে। এর আগে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণির নামও শোনা গেলেও সরকারের দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, তার রাষ্ট্রপতি হওয়ার সম্ভাবনা এখন অনেকটাই কম। ফলে শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের মধ্য থেকেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সম্ভাবনা বেশি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য বিশেষ সংসদ অধিবেশন আহ্বানের প্রয়োজন নেই। ১৫ জুলাই সংসদের সর্বশেষ অধিবেশন শেষ হয়েছে। সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী ৬০ দিনের মধ্যে পরবর্তী অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে এবং সেই অধিবেশনেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে।
এদিকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন। সংসদ সদস্যদের ভোটার তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার পর তফসিল ঘোষণা করা হবে। একাধিক প্রার্থী থাকলে জাতীয় সংসদ ভবনে প্রকাশ্য ব্যালটে ভোট হবে। আর বৈধ প্রার্থী একজনই হলে তাকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করা হবে।
সবকিছু বিবেচনায় এখন পর্যন্ত ইঙ্গিত মিলছে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সেপ্টেম্বরেই অনুষ্ঠিত হতে পারে। আর দলীয় প্রার্থী হলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নামই আলোচনায় সবচেয়ে এগিয়ে থাকলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য নজর এখন বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকের দিকে।








