সম্প্রতি দেশের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডকে ঘিরে গ্রাহকদের মধ্যে নগদ টাকা উত্তোলনের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিভিন্ন শাখা থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মাত্র পাঁচ কার্যদিবসে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বেশি আমানত উত্তোলন হয়েছে ব্যাংকটি থেকে। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যে একাধিক কারণ ও উদ্বেগ উঠে এসেছে।
কী ঘটছে ব্যাংকটিতে?
কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, সাম্প্রতিক সময়ে গ্রাহকদের মধ্যে নগদ টাকা তুলে নেওয়ার প্রবণতা দ্রুত বেড়েছে। বিশেষ করে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে খোরশেদ আলম দায়িত্ব গ্রহণের প্রক্রিয়া ঘিরে অনিশ্চয়তা ও আলোচনা এই প্রবণতাকে আরও ত্বরান্বিত করেছে।
প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, প্রথম চার কার্যদিবসে প্রায় ২ হাজার ৫৭০ কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। পরবর্তী এক দিনে আরও প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়েছে বলে ধারণা করছে ব্যাংক-সংশ্লিষ্টরা। সেই হিসাবে, মোট পাঁচ দিনে আনুমানিক ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বেশি অর্থ বেরিয়ে গেছে ব্যাংকটির বিভিন্ন শাখা থেকে।
এছাড়া ব্যাংকের একাধিক শাখায় দীর্ঘ সারি ও দ্রুত নগদ উত্তোলনের চাপ দেখা গেছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
টাকা উত্তোলনের হিড়িক পড়েছে কেন?
বিশেষজ্ঞ ও ব্যাংক সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, একাধিক বিষয় একসঙ্গে কাজ করেছে। তার মধ্যে নেতৃত্ব পরিবর্তন নিয়ে অনিশ্চয়তা, বিক্ষোভ ও প্রশাসনিক অস্থিরতা, বিক্ষোভ ও প্রশাসনিক অস্থিরতা এবং আস্থার সংকটকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মূলত গেল ২৪ মে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে খুরশিদ আলমকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে দায়িত্ব গ্রহণকে কেন্দ্র করে ব্যাংকের ভেতরে ও বাইরে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ দেখা দেয়, যা গ্রাহকদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করে। বিগত সরকারের মেয়াদকালে দেশের সর্ববৃহৎ এই ব্যাংকটি দখলে দেয় এস আলম গ্রুপ। সে সময় সরকারের প্রত্যক্ষ সমর্থনে ব্যাংকটি দখল করে গ্রুপ অব কোম্পানিটি। সেই ঘটনা আবারও পুনরাবৃত্তির আশঙ্কায় গ্রাহকরা ব্যাংকটির নেতৃত্বের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে চেয়ারম্যানের নিয়োগের পর ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ হয় এবং বোর্ড সভা ব্যাহত হওয়ার ঘটনাও ঘটে। এসব খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ে। যা গ্রাহকদেরকে নিজেদের সঞ্চিত অর্থের বিষয়ে আরও বেশি উদ্বেগ করে তোলে।
এছাড়া ব্যাংকিং খাতে সাম্প্রতিক সময়ে নগদ অর্থ রাখার প্রবণতা কমে যাওয়া এবং আস্থার ঘাটতি, এই পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে।
ব্যাংক ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অবস্থান কী?
ইসলামী ব্যাংকের এমন পরিস্থিতি নিজেদের পর্যবেক্ষণে আছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, ব্যাংকটি এখনো স্বাভাবিকভাবে উত্তোলন চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম। এর মধ্যেও প্রয়োজন হলে তারল্য সহায়তা দেওয়া হবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়মিত মনিটর করা হচ্ছে।
অন্যদিকে ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক গ্রাহকদের আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমান অবস্থায় আমানত উত্তোলনের কারণে তাৎক্ষণিক কোনো ঝুঁকি নেই।
ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার প্রেক্ষাপট
গত এক বছরে ইসলামী ব্যাংকের আমানত ভিত্তি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল। ব্যাংকটির মোট আমানত প্রায় ১ লাখ ৮৩ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছায়। অর্থাৎ দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাংকটি প্রবৃদ্ধির ধারায় ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েক দিনের উত্তোলন প্রবণতা সেই স্থিতিশীলতার ওপর চাপ তৈরি করেছে বলে কর্মকর্তারা মনে করছেন।
এটি কি ব্যাংক সংকট?
বর্তমান পরিস্থিতিকে এখনই পূর্ণাঙ্গ ব্যাংক সংকট বলা হচ্ছে না। তবে অর্থনীতিবিদদের দৃষ্টিতে এটি একটি আস্থা-সংকট, যেখানে- গুজব বা অনিশ্চয়তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, গ্রাহকরা নিরাপদ মনে করে নগদ উত্তোলনে ঝুঁকে পড়েন, ফলে স্বল্প সময়ে তারল্যের ওপর চাপ তৈরি হয়।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থ রাখার প্রবণতা বেড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থের পরিমাণও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি ব্যাংকিং খাতে আস্থার ওপর একটি বৃহত্তর চাপের ইঙ্গিত দেয়।








