মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী দুই দেশ ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। সম্প্রতি ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। এরপর থেকেই প্রশ্ন উঠেছে, কেন এই হামলা, এর পেছনে কী কারণ রয়েছে? আর এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক হামলাকে শুধু একটি তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র বোঝা যাবে না। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের শত্রুতা, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা এবং একের পর এক হামলা-পাল্টা হামলার জটিল ইতিহাস।
প্রতিশোধ ও প্রতিরোধের বার্তা
ইরান বলছে, তাদের হামলার মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রতিশোধ নেওয়া এবং নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করা। তেহরানের দাবি, ইসরায়েল সম্প্রতি লেবাননের বৈরুতে তাদের মিত্রদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। ইরানের দৃষ্টিতে এটি শুধু একটি সামরিক অভিযান নয়, বরং তাদের আঞ্চলিক মিত্রজোটের ওপর সরাসরি আঘাত।
ফলে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে দেখাতে চেয়েছে যে, তাদের মিত্রদের ওপর হামলা হলে তারা নীরব থাকবে না। একই সঙ্গে এটি ছিল প্রতিপক্ষের উদ্দেশে একটি রাজনৈতিক ও সামরিক বার্তা।
পুরনো শত্রুতার নতুন অধ্যায়
ইরান ও ইসরায়েলের বৈরিতা নতুন নয়। কয়েক দশক ধরেই দুই দেশের সম্পর্ক চরম উত্তেজনাপূর্ণ। তবে দীর্ঘ সময় তারা সরাসরি যুদ্ধের পরিবর্তে বিভিন্ন মিত্র ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর মাধ্যমে পরোক্ষ সংঘাতে জড়িত ছিল।
ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে নিজেদের ঘনিষ্ঠ মিত্র ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দিয়ে থাকে। এর মধ্যে লেবাননের হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনের হামাস এবং ইয়েমেনের হুথিরা অন্যতম। অন্যদিকে ইসরায়েল মনে করে, এসব গোষ্ঠীর কার্যক্রম এবং ইরানের ক্রমবর্ধমান প্রভাব তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি।
এ ছাড়া ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে ইসরায়েল। ফলে দুই দেশের দ্বন্দ্ব শুধু সীমান্ত বা সামরিক বিষয়েই সীমাবদ্ধ নয়; এটি কৌশলগত ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বৃহত্তর প্রতিযোগিতার অংশ।
হামলা-পাল্টা হামলার চক্র
গত এক বছরে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সরাসরি সংঘাতের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিভিন্ন সময়ে ইসরায়েল ইরানের সামরিক, নিরাপত্তা ও জ্বালানি-সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে ইরানও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে পাল্টা আঘাত হেনেছে। ফলে দুই দেশের মধ্যে যে সংঘাত একসময় ছায়াযুদ্ধের পর্যায়ে ছিল, তা এখন অনেক বেশি প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে।
সাম্প্রতিক হামলাও সেই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। অর্থাৎ এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে চলা উত্তেজনার সর্বশেষ অধ্যায়।
মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তারের লড়াই
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আঞ্চলিক নেতৃত্বের প্রশ্ন। ইরান নিজেকে মধ্যপ্রাচ্যে তথাকথিত প্রতিরোধ অক্ষের অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করে। এই জোটের লক্ষ্য হিসেবে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব মোকাবিলার বিষয়টি তুলে ধরা হয়।
ফলে গাজা, লেবানন, সিরিয়া বা অঞ্চলের অন্য কোথাও ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপকে ইরান প্রায়ই বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। সেই কারণেই মিত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপর আঘাতকে অনেক সময় তারা নিজেদের স্বার্থের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ হিসেবে দেখে।
সামনে কী?
সাম্প্রতিক হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক মহলের আশঙ্কা, ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সরাসরি সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে তা পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ উভয় পক্ষকে সংযত থাকার আহ্বান জানাচ্ছে। কূটনৈতিক পর্যায়েও উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা চলছে।
তবে বাস্তবতা হলো, ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার দ্বন্দ্ব এখন শুধু দুই দেশের বিরোধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, মিত্রজোটের রাজনীতি, সামরিক কৌশল এবং মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তারের দীর্ঘ প্রতিযোগিতা। আর সেই কারণেই সাম্প্রতিক হামলাকে একটি একক ঘটনার বদলে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক সংঘাতের অংশ হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা।








