মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬

সবশেষ

ছায়া বা বিকল্প বাজেট কী, সরকারের বিপরীতে জামায়াতের বাজেট প্রস্তাব কত, কেন?

জাতীয় বাজেট ঘোষণার আগে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রস্তাবিত বিকল্প বা ছায়া বাজেট। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য দলটি ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকার একটি বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করেছে। সরকারের আনুষ্ঠানিক বাজেটের আগে এমন বিকল্প প্রস্তাব সামনে আসায় আবারও আলোচনায় এসেছে ‘ছায়া বাজেট’ ধারণাটি।

মঙ্গলবার রাজধানীর মগবাজারে আল ফালাহ মিলনায়তনে আয়োজিত ‘জনমুখী বাজেট ২০২৬-২৭ প্রস্তাবনা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে বাজেটটি উপস্থাপন করেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন।

কোন খাতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব?
জামায়াতের প্রস্তাবিত বাজেট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছে জনপ্রশাসন খাতে। এ খাতে বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে ২ লাখ ২ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ২৪ দশমিক ০৯ শতাংশ।

এরপরই রয়েছে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধ খাত। এ খাতে বরাদ্দ ধরা হয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ১৫ দশমিক ১৯ শতাংশ।

শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে ১ লাখ ২৫ হাজার ৫৭৫ কোটি টাকা বা মোট বাজেটের প্রায় ১৫ শতাংশ। এছাড়া পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে ৬৫ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা, কৃষি খাতে ৫১ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা এবং সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণ খাতে ৪৮ হাজার ১৫০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন, প্রতিরক্ষা, জনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা এবং জ্বালানি খাতেও উল্লেখযোগ্য বরাদ্দের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

ছায়া বাজেট আসলে কী?
ছায়া বাজেট বা বিকল্প বাজেট হলো সরকারের আনুষ্ঠানিক বাজেটের বাইরে কোনো রাজনৈতিক দল, গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা নীতিনির্ধারণী সংস্থার প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক পরিকল্পনা।

এটি আইনগতভাবে রাষ্ট্রীয় বাজেট নয়। এর কোনো বাধ্যবাধকতাও নেই। তবে এর মাধ্যমে একটি দল দেখানোর চেষ্টা করে, তারা ক্ষমতায় থাকলে কীভাবে অর্থনীতি পরিচালনা করত, কোথা থেকে রাজস্ব সংগ্রহ করত এবং কোন খাতে বেশি গুরুত্ব দিত। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, এটি একটি বিকল্প অর্থনৈতিক রূপরেখা।

রাজনৈতিক দলগুলো কেন ছায়া বাজেট দেয়?
বিশ্বের অনেক গণতান্ত্রিক দেশে বিরোধী দলগুলো নিয়মিত ছায়া বাজেট প্রকাশ করে। এর মূল উদ্দেশ্য সরকারের নীতির সমালোচনা করা নয়, বরং নিজেদের বিকল্প পরিকল্পনা তুলে ধরা।

জামায়াতের ক্ষেত্রেও বিষয়টি একইভাবে দেখা হচ্ছে। দলটি এর মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি, মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং করব্যবস্থা নিয়ে নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি জনগণের সামনে তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে এটি রাজনৈতিকভাবেও একটি বার্তা দেয়, দলটি শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যে সীমাবদ্ধ নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য অর্থনৈতিক পরিকল্পনাও প্রস্তুত রেখেছে।

ছায়া বাজেটের সুবিধা কী?
অর্থনীতিবিদদের মতে, ছায়া বাজেটের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি নীতিগত প্রতিযোগিতা তৈরি করে। সরকারের বাইরে থাকা দলগুলো যখন বিকল্প প্রস্তাব দেয়, তখন জনগণ বিভিন্ন অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে জানতে পারে।

এতে বাজেট নিয়ে জনআলোচনা বাড়ে, নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা আসে এবং সরকারের প্রস্তাবিত বাজেটও তুলনামূলকভাবে বেশি বিশ্লেষণের সুযোগ পায়। এছাড়া ভবিষ্যতে ক্ষমতায় এলে একটি দল কী ধরনের অর্থনৈতিক নীতি অনুসরণ করতে পারে, সে সম্পর্কেও আগাম ধারণা পাওয়া যায়।

কোনো সীমাবদ্ধতা আছে?
তবে ছায়া বাজেট নিয়ে কিছু সমালোচনাও রয়েছে। কারণ এটি বাস্তবায়নের দায় বহন করতে হয় না। ফলে অনেক সময় রাজনৈতিক দলগুলো জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্য উচ্চাভিলাষী বা আকর্ষণীয় প্রস্তাব দিতে পারে, যার বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব, তা স্পষ্ট থাকে না।

আবার রাজস্ব আদায়ের বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ছাড়া ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাবও দেওয়া হতে পারে। ফলে এসব বাজেটের অর্থনৈতিক কার্যকারিতা নিয়ে আলাদা বিশ্লেষণের প্রয়োজন হয়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে গুরুত্ব কতটা?
বাংলাদেশে ছায়া বাজেটের প্রচলন খুব বেশি না থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন এ ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এটি একটি ইতিবাচক চর্চা। কারণ এতে অর্থনীতি নিয়ে বিকল্প চিন্তা ও নীতিগত বিতর্কের সুযোগ তৈরি হয়।

তবে শেষ পর্যন্ত ছায়া বাজেট কোনো সরকারি দলিল নয়। এটি মূলত একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রস্তাবনা, যার মাধ্যমে একটি দল দেশের অর্থনীতি পরিচালনায় নিজেদের অগ্রাধিকার ও পরিকল্পনা জনগণের সামনে তুলে ধরে।

সেই বিবেচনায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য জামায়াতে ইসলামীর ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকার বিকল্প বাজেটকে কেবল একটি আর্থিক প্রস্তাব নয়, বরং দলের অর্থনৈতিক দর্শনের প্রকাশ হিসেবেও দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *