বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

সবশেষ

অ্যাপাচি হেলিকপ্টার কী, হরমুজে বিধ্বস্ত হেলিকপ্টারই কি ফের যুদ্ধ বাধাল?

মধ্যপ্রাচ্যে আবারও যুদ্ধের সূচনা করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ইরান নিয়ন্ত্রিত বিশ্বের অন্যতম প্রধান জলপথ হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন অ্যাপাচি হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় এই যুদ্ধের সূচনা হয়। ফলে প্রশ্ন উঠছে, অ্যাপাচি হেলিকপ্টার কী, কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই যুদ্ধযানটি, হরমুজে বিধ্বস্ত হেলিকপ্টারই কি ফের যুদ্ধ বাধাল?

অ্যাপাচি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
তথ্য বলছে, আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে অ্যাপাচি হেলিকপ্টার মূলত পূর্ণাঙ্গ আকাশযুদ্ধ প্ল্যাটফর্ম। মার্কিন নির্মাতা বোয়িংয়ের তৈরি এএইচ-৬৪ অ্যাপাচি বিশ্বের সবচেয়ে কার্যকর অ্যাটাক হেলিকপ্টারগুলোর একটি। ট্যাংক ধ্বংস, শত্রুর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অকার্যকর করা, স্থলবাহিনীকে আকাশ থেকে সহায়তা দেওয়া এবং যুদ্ধক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক নজরদারি পরিচালনার ক্ষেত্রেই এর ব্যবহার অনন্য। ফলে যুদ্ধাঞ্চলে একটি অ্যাপাচির উপস্থিতি সাধারণত বড় ধরনের সামরিক কর্মকাণ্ডের ইঙ্গিত দেয়।

সামরিক বিশ্লেষকদের ভাষায়, মার্কিনিদের কাছে অ্যাপাচি হারানো সাধারণ কোনো ঘটনা নয়। বরং যুদ্ধক্ষেত্রে এটি দেশটির কাছে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদ হারানো।

হরমুজে কী ঘটেছিল?
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক করিডর। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের বড় অংশ এই পথ দিয়ে চলাচল করে। এই অঞ্চলের আকাশে টহলরত একটি মার্কিন অ্যাপাচি হেলিকপ্টার মঙ্গলবার বিধ্বস্ত হয়।

ঘটনার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমে জানান, হেলিকপ্টারের দুই পাইলটই নিরাপদে আছেন এবং তাদের কোনো ক্ষতি হয়নি। তিনি বলেন, ঘটনার কারণ তদন্ত করা হচ্ছে।

কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মার্কিন প্রশাসনের বক্তব্যের সুর বদলে যেতে শুরু করে। ওয়াশিংটনের দাবি, প্রাথমিক সামরিক মূল্যায়নে দেখা গেছে ইরানের কর্মকাণ্ডের ফলেই হেলিকপ্টারটি ভূপাতিত হয়েছে। এরপর ট্রাম্প সরাসরি বলেন, এই ঘটনার জবাব দেওয়া প্রয়োজন এবং যুক্তরাষ্ট্র হামলার প্রতিক্রিয়া জানাবে।

তাহলে কি এই ঘটনাই যুদ্ধের সূচনা করল?
কৌশলগতভাবে দেখলে উত্তরটি আংশিক ‘হ্যাঁ’। কারণ হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হওয়ার পরই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অভ্যন্তরে সামরিক অভিযান শুরু করে। কিন্তু বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে এটি যুদ্ধের একমাত্র কারণ নয়। বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই উত্তেজনা জমা হচ্ছিল।

হরমুজ প্রণালীতে সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি, ড্রোন নজরদারি, আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর সক্রিয়তা এবং পারস্য উপসাগরকেন্দ্রিক শক্তির প্রতিযোগিতার কারণে দুই দেশের সম্পর্ক ইতোমধ্যেই সংঘর্ষের কিনারায় পৌঁছে গিয়েছিল। অ্যাপাচি বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনা মূলত সেই জমে থাকা উত্তেজনার বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। অর্থাৎ, এটি ট্রিগার কিন্তু মূল কারণ নয়।

যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে জবাব দিল?
অ্যাপাচি হেলিকপ্টার বিধ্বস্তের ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। তেহরানের দাবি অনুযায়ী, জাস্ক, সিরিক এবং কেশম দ্বীপসহ বিভিন্ন স্থানে আঘাত হানা হয়। ইরান জানিয়েছে, এসব হামলায় একটি টেলিযোগাযোগ টাওয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং কয়েকটি অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে।

অন্যদিকে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) বলেছে, তাদের অভিযান ছিল ইরানের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ‘সমানুপাতিক জবাব’। অর্থাৎ ওয়াশিংটনের ভাষ্য অনুযায়ী, এই প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে তারা পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের সূচনা করতে চায়নি; কিন্তু প্রতিশোধমূলক সামরিক বার্তা দিয়েছে।

ইরানের পাল্টা জবাব কতটা শক্তিশালী ও গুরুত্বপূর্ণ?
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ২১টি মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। সবচেয়ে আলোচিত দাবি হলো, বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তরের বিরুদ্ধে ড্রোন হামলা। এই নৌবহরকে পারস্য উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির প্রধান কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে সেখানে হামলার দাবি শুধু সামরিকভাবে নয়, প্রতীকী দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আইআরজিসি আরও জানিয়েছে, তারা কুয়েতের আলি আল সালেম বিমানঘাঁটি এবং জর্ডানের আল-আজরাক ঘাঁটিকেও লক্ষ্যবস্তু করেছে। জর্ডানে অবস্থিত ঘাঁটির বিষয়ে ইরান দাবি করেছে, ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের হ্যাঙ্গার এবং একটি কমান্ড সেন্টার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তবে জর্ডান বলছে, তারা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে এবং কোনো বড় ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।

এমকিউ-৯ ড্রোন ভূপাতিত করার দাবির তাৎপর্য কী?
আইআরজিসি দাবি করেছে, তারা দক্ষিণ ইরানের আকাশে একটি মার্কিন এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন ভূপাতিত করেছে। ঘটনাটি সত্য হলে, এটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এমকিউ-৯ রিপার শুধু নজরদারি করে না, বরং হামলা চালাতেও সক্ষম একটি অত্যাধুনিক ড্রোন। এ ধরনের প্ল্যাটফর্ম ধ্বংস করতে পারা মানে, প্রতিপক্ষের আকাশসীমা নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা প্রদর্শন করা।

তবে যুদ্ধক্ষেত্রে উভয় পক্ষ প্রায়ই নিজেদের সাফল্য বাড়িয়ে তুলে ধরে। ফলে এ ধরনের দাবির স্বাধীন যাচাই গুরুত্বপূর্ণ।

সামনে কী হতে পারে?
বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান কেউই এখনই পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ চায় না। ওয়াশিংটন সীমিত প্রতিশোধমূলক হামলার কথা বলছে। অন্যদিকে তেহরান পাল্টা আঘাত করলেও, সরাসরি সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণা করেনি। তবে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো ভুল হিসাব বা ভুল বার্তা।

মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ইতিহাস দেখিয়েছে, অনেক সময় একটি ড্রোন, একটি ক্ষেপণাস্ত্র কিংবা একটি বিমান ভূপাতিত হওয়ার ঘটনাই বড় আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে। হরমুজে বিধ্বস্ত অ্যাপাচি হেলিকপ্টারটি সেই ধরনের একটি মোড়বদলের ঘটনা হয়ে উঠবে কি না, সেটি এখনো নিশ্চিত নয়।

তবে, এটুকু স্পষ্ট যে একটি হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বহুদিনের জমে থাকা উত্তেজনা আবারও প্রকাশ্যে বিস্ফোরিত হয়েছে, আর সেই অভিঘাত এখন ছড়িয়ে পড়ছে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *