বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬

সবশেষ

রাজস্বের পাহাড়, ঘাটতির রেকর্ডের কঠিন পরীক্ষার মুখে বাজেট ঘোষণা

দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায় এবং সর্বোচ্চ বাজেট ঘাটতির দ্বৈত চ্যালেঞ্জ সামনে রেখে জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট উপস্থাপন শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেল ৩টায় জাতীয় সংসদে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব উত্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। নতুন সরকারের প্রথম এবং দেশের ৫৫তম বাজেট হিসেবে এটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।

এবারের বাজেটের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রেকর্ড রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য এবং প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার নিট ঘাটতি। একই সঙ্গে ব্যক্তি করদাতাদের জন্য প্রথমবারের মতো পাঁচ বছরের আয়কর রোডম্যাপ ঘোষণা করা হচ্ছে, যা করব্যবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদে পূর্বানুমানযোগ্য করার উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

উন্নয়ন ব্যয়ে জোর, ভর্তুকিতেও বড় অঙ্ক
আগামী অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকায় নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে এবং ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক সহায়তা ও প্রকল্প ঋণ থেকে সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। চলমান মেগা প্রকল্পের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং নতুন অবকাঠামো উন্নয়ন ত্বরান্বিত করাই এ বরাদ্দের প্রধান লক্ষ্য।

অন্যদিকে বিদ্যুৎ, গ্যাস, সার ও খাদ্য খাতে আগামী অর্থবছরে প্রায় ১ লাখ ১৭ হাজার কোটি থেকে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত ভর্তুকি ও প্রণোদনা দিতে হবে সরকারকে। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং নিত্যপণ্যের মূল্যচাপ মোকাবিলায় এই ব্যয় অপরিহার্য বলে মনে করছে সরকার।

এনবিআরের সামনে বিশাল রাজস্ব চ্যালেঞ্জ
প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়নের জন্য রাজস্ব আহরণের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তার বড় অংশই নির্ভর করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ওপর। মোট ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যের মধ্যে এনবিআরকে একাই আদায় করতে হবে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা।

এর বাইরে এনবিআর-বহির্ভূত কর উৎস থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা এবং কর-বহির্ভূত রাজস্ব খাত থেকে ৬৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।

এনবিআরের রাজস্ব লক্ষ্যের মধ্যে সবচেয়ে বড় অবদান আসবে ভ্যাট খাত থেকে, যেখানে ২ লাখ ২৮ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে। আয়কর ও মূলধনী মুনাফা কর থেকে আদায়ের লক্ষ্য ২ লাখ ১৯ হাজার ৮৫ কোটি টাকা। এছাড়া সম্পূরক শুল্ক থেকে ৮২ হাজার ২৮৩ কোটি টাকা, আমদানি শুল্ক থেকে ৬১ হাজার ৯৩৯ কোটি টাকা, আবগারি শুল্ক থেকে ৭ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা এবং রপ্তানি শুল্ক থেকে ৯৯ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

ঘাটতি মেটাতে বাড়ছে ঋণনির্ভরতা
প্রস্তাবিত ব্যয় ও সম্ভাব্য আয়ের ব্যবধান থেকে সৃষ্টি হয়েছে ইতিহাসের সর্বোচ্চ বাজেট ঘাটতি। এই ঘাটতি পূরণে সরকার বৈদেশিক উৎস থেকে প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে।

অভ্যন্তরীণ ঋণের মধ্যে ব্যাংক খাত থেকেই সংগ্রহ করা হবে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা, আর সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য উৎস থেকে আসবে ১৫ হাজার কোটি টাকা।

ঋণের পরিমাণ বাড়ার ফলে আগামী অর্থবছরে সুদ পরিশোধেই ব্যয় হবে প্রায় ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। তবে সরকারের লক্ষ্য আগামী অর্থবছরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৬ শতাংশে উন্নীত করা এবং মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনা।

কর পরিবর্তনে বাড়তে পারে কিছু পণ্যের দাম
কর কাঠামোয় ব্যাপক পরিবর্তনের ফলে বেশ কয়েকটি পণ্যের বাজারমূল্য বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ধূমপান নিরুৎসাহিত করতে সিগারেট ও নিকোটিনজাত পণ্যের ওপর বাড়তি কর আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী নিম্নস্তরের ১০ শলাকার সিগারেটের প্যাকেটের মূল্য ৬২ টাকা, মধ্যম স্তরের ৯২ টাকা, উচ্চ স্তরের ১৬০ টাকা এবং প্রিমিয়াম স্তরের ২১০ টাকা নির্ধারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

এছাড়া সিগারেট ফিল্টার পেপার আমদানিতে ৩০০ শতাংশ এবং আমদানিকৃত ইন্ডাস্ট্রিয়াল নিকোটিনের ওপর ৩৫০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের ফলে বাজারে সিগারেট ও নিকোটিন পাউচের দাম বাড়তে পারে।

দেশীয় ও বিদেশি মদজাতীয় পণ্যের ওপরও কর বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি কাজুবাদামের আমদানি শুল্ক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ এবং আমদানি করা হিমায়িত মাছের ওপর নতুন ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

নির্মাণ খাতেও চাপ বাড়তে পারে। এমএস রড উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট ও কর প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব এসেছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন বিদেশি প্রসাধনী ও বিলাসপণ্যের ওপর নতুন করে ২০ শতাংশ ভ্যাট আরোপের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ইলেকট্রনিকস ও নিত্যপণ্যে স্বস্তির বার্তা
অন্যদিকে দেশীয় শিল্প সুরক্ষায় বেশ কিছু খাতে কর ছাড়ের প্রস্তাব এসেছে। ফ্রিজ, রেফ্রিজারেটর ও এসির উৎপাদন পর্যায়ের ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাড়ে ৭ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

স্থানীয় মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপ উৎপাদন শিল্পের জন্য বিদ্যমান ভ্যাট সুবিধা ২০৩০ সাল পর্যন্ত বহাল রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। মোবাইল হ্যান্ডসেট উৎপাদনে ব্যবহৃত ২২ ধরনের কাঁচামালের আমদানিতে আগাম কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে।

এছাড়া চাল, গম, আলু, পেঁয়াজ, ভোজ্যতেলসহ প্রায় ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষিপণ্যের সরবরাহ পর্যায়ে উৎসে কর কমিয়ে ০.৫ শতাংশ নির্ধারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্কও প্রত্যাহারের উদ্যোগ রয়েছে।

সোলার সরঞ্জাম ও লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারিসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক শূন্য করার প্রস্তাবও রাখা হয়েছে। পাশাপাশি জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামে কর ছাড়ের মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

পাঁচ বছরের আয়কর রোডম্যাপে নতুন দিগন্ত
এবারের বাজেটের সবচেয়ে আলোচিত উদ্যোগগুলোর একটি হলো ব্যক্তি করদাতাদের জন্য পাঁচ বছরের আয়কর রোডম্যাপ।

এ অনুযায়ী ২০২৬-২৭ এবং ২০২৭-২৮ করবর্ষে সাধারণ করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করা হবে। ২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ করবর্ষে এটি ৪ লাখ টাকা এবং ২০৩০-৩১ করবর্ষে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকায় উন্নীত হবে।

নারী করদাতা ও ৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব প্রবীণ নাগরিকদের জন্য করমুক্ত আয়ের সীমা ধাপে ধাপে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। তৃতীয় লিঙ্গের করদাতা ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্যও করমুক্ত আয়ের সীমা পর্যায়ক্রমে ৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকা পর্যন্ত উন্নীত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা এবং গণঅভ্যুত্থানের গেজেটভুক্ত ‘জুলাই যোদ্ধাদের’ জন্য করমুক্ত আয়ের সীমা সর্বোচ্চ ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিবন্ধী সন্তানের পিতা-মাতা বা আইনানুগ অভিভাবকদের জন্য অতিরিক্ত ৫০ হাজার টাকা আয় করমুক্ত রাখার সুবিধাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

উচ্চ আয়ের করদাতাদের ওপর বাড়তি চাপ
নতুন কর কাঠামোয় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের করদাতাদের জন্য বিদ্যমান প্রগতিশীল ব্যবস্থা বহাল থাকলেও উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের ওপর করের হার বাড়ানোর প্রস্তাব এসেছে।

২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ করবর্ষে ৩৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আয়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ করহার ২৫ শতাংশ থাকবে। এর বেশি আয়ের ওপর ৩০ শতাংশ কর আরোপ করা হবে।

অন্যদিকে ২০২৮-২৯ করবর্ষ থেকে বছরে ৩ কোটি টাকার বেশি আয়ের ব্যক্তিদের জন্য সর্বোচ্চ ৩৫ শতাংশ করহার কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে, যা ২০৩০-৩১ করবর্ষেও বহাল থাকবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি কর রোডম্যাপ বিনিয়োগ ও আর্থিক পরিকল্পনায় স্থিতিশীলতা আনবে। তবে রেকর্ড রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাংকনির্ভর ঋণ ব্যবস্থাপনার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে এই বিশাল বাজেট বাস্তবায়ন করাই আগামী অর্থবছরে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *