শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬

সবশেষ

ইরানের জব্দকৃত ২৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়তে রাজি ট্রাম্প, কবে-কেন জব্দ হয়েছিল এই সম্পদ?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ২৪ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ অবমুক্ত করতে সম্মত হয়েছেন বলে দাবি করেছে ইরানের সংবাদমাধ্যম ফার্স নিউজ এজেন্সি। যদিও এ বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো নিশ্চিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি, তবুও খবরটি মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, যে সম্পদ অবমুক্ত করার কথা বলা হচ্ছে, সেটি কবে এবং কেন জব্দ করা হয়েছিল?

সম্পদ জব্দের ইতিহাস কোথায়?
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পদ জব্দের ইতিহাস চার দশকেরও বেশি পুরোনো। ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের পর দুই দেশের সম্পর্ক দ্রুত অবনতির দিকে যায়। একই বছরের নভেম্বরে তেহরানে মার্কিন দূতাবাস দখল করে ৫২ জন মার্কিন কূটনীতিককে জিম্মি করা হয়।

এই ঘটনার পর তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা ইরানের বিপুল পরিমাণ সম্পদ জব্দ করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করা, জিম্মিদের মুক্তি নিশ্চিত করা এবং সম্ভাব্য ক্ষতিপূরণের দাবির জন্য অর্থ সংরক্ষণ করা।

পরবর্তীতে ১৯৮১ সালের আলজিয়ার্স চুক্তির মাধ্যমে জিম্মি সংকটের অবসান ঘটলেও সব সম্পদ ইরানকে ফেরত দেওয়া হয়নি। বিভিন্ন আইনি জটিলতা, নিষেধাজ্ঞা এবং ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত মামলার কারণে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ দীর্ঘদিন ধরে স্থগিত অবস্থায় থেকে যায়।

কেন বারবার ইরানের সম্পদ আটকে দেওয়া হয়েছে?
শুধু জিম্মি সংকট নয়, পরবর্তী কয়েক দশকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, সন্ত্রাসবাদে সহায়তার অভিযোগ এবং আঞ্চলিক সংঘাতে ভূমিকার কারণেও যুক্তরাষ্ট্র একাধিক দফায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

ফলে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের বিদেশে থাকা সম্পদ ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের একটি অংশ কার্যত অচল হয়ে পড়ে। কিছু ক্ষেত্রে মার্কিন আদালতের রায়ে এসব অর্থের অংশ বিশেষ সন্ত্রাসী হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন নাগরিকদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ হিসেবেও দেওয়া হয়েছে।

এখন কেন সম্পদ ছাড়ার আলোচনা?
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা মোহসেন রেজাইয়ের দাবি, ট্রাম্প প্রশাসন ২৪ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ অবমুক্ত করতে সম্মত হয়েছে। তবে ট্রাম্প নাকি বিষয়টি প্রকাশ্যে ঘোষণা করতে চাননি।

রেজাইয়ের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা চলছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফও জানিয়েছেন, দুই দেশ একটি চূড়ান্ত খসড়ার কাছাকাছি পৌঁছেছে।

একই সময়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি সম্ভাব্য সমঝোতা আঞ্চলিক সংঘাত প্রশমিত করতে পারে এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিলের পথ খুলে দিতে পারে।

অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি নিয়ে অগ্রগতি হচ্ছে এবং এর মাধ্যমে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণে আনার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।

২৪ বিলিয়ন ডলার কি শুধু অর্থনৈতিক বিষয়?
বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি শুধু অর্থ ফেরতের প্রশ্ন নয়। বরং এটি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ভবিষ্যৎ, নিষেধাজ্ঞা নীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

যদি সত্যিই এই অর্থ অবমুক্ত করা হয়, তাহলে তা দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা কমানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হবে। একই সঙ্গে এটি ইরানের অর্থনীতির জন্যও বড় ধরনের স্বস্তি বয়ে আনতে পারে, কারণ দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তবে এখনো পর্যন্ত ওয়াশিংটনের আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ না থাকায় ২৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়ের বিষয়টি দাবির পর্যায়েই রয়েছে। ফলে এই অর্থ সত্যিই অবমুক্ত হবে কি না, তা নির্ভর করছে চলমান কূটনৈতিক আলোচনা ও সম্ভাব্য চুক্তির অগ্রগতির ওপর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *