মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬

সবশেষ

হাজিরা খাতার ছবি পাঠাতে গাছের ডালে প্রধান শিক্ষক, ফাইভ জি’র যুগেও নেটওয়ার্ক সংকট কেন?

দেশজুড়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনলাইন হাজিরা কার্যক্রম শুরুর প্রথম দিনেই সামনে এসেছে পাহাড়ি অঞ্চলের যোগাযোগ-সংকটের বাস্তব চিত্র। রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার এক প্রধান শিক্ষক হাজিরা খাতার ছবি পাঠাতে বাধ্য হয়েছেন গাছে উঠে। সেই মুহূর্তের একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

ছবিতে দেখা যায়, একটি গাছের ডালে অবস্থান করে মোবাইল ফোনে কাজ করছেন একজন ব্যক্তি। তিনি বাঘাইছড়ি উপজেলার পাগয্যাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আবু তাহের। সোমবার বিদ্যালয়ের হাজিরা সংক্রান্ত তথ্য পাঠানোর সময় নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে তাঁকে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়।

জানা গেছে, বিদ্যালয়টি রূপকারী ইউনিয়নে অবস্থিত। উপজেলা সদর থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে দুই পাহাড়ের মাঝখানে ধানখেতঘেরা এলাকায় একতলা ভবনে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এ কারণে সেখানে মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়া দীর্ঘদিন ধরেই একটি বড় সমস্যা।

মোহাম্মদ আবু তাহের জানান, সোমবার থেকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য অনলাইন হাজিরা কার্যক্রম চালু হয়েছে। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, বিদ্যালয়ে উপস্থিতির পর হাজিরা খাতার ছবি তুলে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে পাঠাতে হচ্ছে। পরে সেই তথ্য জেলা হয়ে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে পাঠানো হয়।

তিনি বলেন, ‘স্কুলে এসে প্রথমে ভবনের ছাদে উঠি, কিন্তু নেটওয়ার্ক পাইনি। এরপর প্রায় ৩০ থেকে ৪০ ফুট উঁচু একটি পাহাড়ের চূড়ায়ও চেষ্টা করি। সেখানেও সংযোগ মেলেনি। পরে আমগাছের ডালে উঠে নেটওয়ার্ক পেয়ে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার হোয়াটসঅ্যাপে হাজিরার ছবি পাঠাতে সক্ষম হই।’

প্রধান শিক্ষকের ভাষ্য, পাহাড়ি এলাকার বাস্তব অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় না এনে অনলাইন হাজিরা বাধ্যতামূলক করা হলে অনেক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়মিত তথ্য পাঠাতে সমস্যায় পড়বেন।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাঘাইছড়ি উপজেলায় ১১৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। অনলাইন হাজিরা চালুর প্রথম দিনে ৮৮টি বিদ্যালয়ের তথ্য পাওয়া গেলেও ২৮টি বিদ্যালয়ের ৮৩ জন শিক্ষকের হাজিরা পাওয়া যায়নি।

বাঘাইছড়ি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) সঞ্চয়ন চাকমা জানান, যেসব এলাকায় ফোরজি নেটওয়ার্ক রয়েছে, সেসব বিদ্যালয় অনলাইনে তথ্য পাঠাতে পেরেছে। নেটওয়ার্কবিহীন কিছু বিদ্যালয় এসএমএসের মাধ্যমে উপস্থিতির তথ্য জানিয়েছে। সময়ের সঙ্গে অনলাইন সংযুক্ত বিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়বে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।

অন্যদিকে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য বলছে, রাঙামাটি জেলার মোট ৭০৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে প্রথম দিনে ৫৩৮টি বিদ্যালয়ের অনলাইন হাজিরা পাওয়া গেছে। তবে ১৭০টি বিদ্যালয় এখনো মোবাইল নেটওয়ার্কের আওতার বাইরে রয়েছে।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা কফিল উদ্দিন বলেন, ‘গাছে উঠে হাজিরা পাঠানোর কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। যেখানে নেটওয়ার্ক আছে, সেখান থেকে অনলাইনে তথ্য নেওয়া হচ্ছে। কোথাও এসএমএসের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। আর যেসব বিদ্যালয়ে কোনো ধরনের সংযোগই পাওয়া যাচ্ছে না, সেগুলোর তালিকা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে।’

পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম জেলা পরিষদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়। বিষয়টি নিয়ে রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কাজল তালুকদার বলেন, মোবাইল নেটওয়ার্কবিহীন এলাকায় অনলাইন হাজিরা বাস্তবায়ন করা কঠিন। দুর্গম অঞ্চলে নেটওয়ার্ক সুবিধা সম্প্রসারণে সংশ্লিষ্ট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *