বিশ্বকাপের মঞ্চে অনেক অঘটনের গল্প আছে। কিন্তু আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে মঙ্গলবার রাতে যা ঘটেছে, তা কেপ ভার্দের ফুটবল ইতিহাসে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। ইউরোপের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন স্পেনকে গোলশূন্য ড্রয়ে আটকে দিয়ে নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপেই বড় বার্তা দিয়েছে আফ্রিকার ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রটি।
ম্যাচের আগে শক্তির পার্থক্য ছিল চোখে পড়ার মতো। একদিকে ২০১০ সালের বিশ্বকাপজয়ী এবং ২০২৪ ইউরো চ্যাম্পিয়ন স্পেন, অন্যদিকে মাত্র পাঁচ লাখ জনসংখ্যার কেপ ভার্দে, যারা এবারই প্রথম বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলছে। তবে মাঠের ৯০ মিনিটে সেই পার্থক্যের প্রতিফলন দেখা যায়নি।
কেপ ভার্দের এই সাফল্যের সবচেয়ে বড় নায়ক গোলরক্ষক ভোজিনিয়া। ৪০ বছর বয়সী এই অভিজ্ঞ ফুটবলার একের পর এক দুর্দান্ত সেভ করে স্পেনের আক্রমণভাগকে হতাশ করেন। পুরো ম্যাচে স্পেন ২৭টি শট নেয়, যার মধ্যে সাতটি ছিল লক্ষ্যে। কিন্তু ভোজিনিয়াকে পরাস্ত করতে পারেনি কেউ।
প্রথমার্ধের শেষ দিকে তার পারফরম্যান্স ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। স্পেনের মিকেল ওইয়ারসাবাল, এমেরিক লাপোর্ত ও ফেরান তোরেসের ধারাবাহিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেন তিনি। তোরেসের একটি শট আবার ক্রসবারে আঘাত করে ফিরে আসে।
দ্বিতীয়ার্ধে স্পেন কোচ বেঞ্চের শক্তি কাজে লাগানোর চেষ্টা করেন। মাঠে নামানো হয় মিকেল মেরিনো, মার্ক কুকুরেয়া এবং তরুণ তারকা লামিনে ইয়ামালকে। কিন্তু কেপ ভার্দের রক্ষণভাগ ছিল অবিচল। সংগঠিত ও শৃঙ্খলাপূর্ণ ডিফেন্স স্পেনের সব পরিকল্পনা ভেস্তে দেয়।
বিশ্বকাপে অভিষেক হলেও কেপ ভার্দের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স মোটেও অবমূল্যায়ন করার মতো ছিল না। আফ্রিকান বাছাইপর্বে তারা ক্যামেরুনকে হারিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। বিশ্বকাপের আগে প্রস্তুতি ম্যাচে সার্বিয়াকে ৩-০ গোলে হারিয়েছিল। তবু স্পেনের মতো দলের বিপক্ষে পয়েন্ট আদায় ছিল অনেকের কাছেই কল্পনার বাইরে।
বিশ্বকাপ ইতিহাসে এর আগে নবাগত দলগুলোর চমক দেখানোর নজির রয়েছে। ২০০২ সালে সেনেগাল ফ্রান্সকে হারিয়েছিল, ১৯৬৬ সালে উত্তর কোরিয়া হারিয়েছিল ইতালিকে। সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরব আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে বিশ্বকে বিস্মিত করেছিল। কেপ ভার্দের এই ড্রও সেই স্মরণীয় ঘটনাগুলোর পাশে জায়গা করে নিতে পারে।
ম্যাচের শেষভাগে স্পেনের বড় ভরসা ছিলেন লামিনে ইয়ামাল। মাত্র ১৮ বছর ৩৪২ দিন বয়সী এই তারকার বাজারমূল্য প্রায় ২০ কোটি ইউরো। অথচ কেপ ভার্দের পুরো দলের সম্মিলিত বাজারমূল্য ৫ কোটি ৪৪ লাখ ইউরোর কাছাকাছি। তবে মাঠে অর্থমূল্যের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে আত্মবিশ্বাস, শৃঙ্খলা ও লড়াইয়ের মানসিকতার প্রমাণ দিয়েছে কেপ ভার্দে।
শেষ বাঁশি বাজার পর আবেগ ধরে রাখতে পারেননি ভোজিনিয়া। চোখের জলেই যেন ফুটে উঠেছিল একটি দেশের স্বপ্নপূরণের গল্প। জোভানে কাবরাল, জামিরো মন্তেইরো, গ্যারি রদ্রিগেজদের নেতৃত্বে কেপ ভার্দে দেখিয়ে দিয়েছে, ফুটবলে বড় নাম কিংবা বড় ইতিহাস নয়, সঠিক দিনে সঠিক লড়াইটাই পার্থক্য গড়ে দেয়।
স্পেনের বিপক্ষে এই গোলশূন্য ড্র কেপ ভার্দের জন্য শুধু একটি পয়েন্ট নয়; এটি বিশ্বমঞ্চে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার এক ঐতিহাসিক ঘোষণা।








