মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬

সবশেষ

‘ব্যক্তি নই, রাষ্ট্রের প্রতিনিধি ছিলাম’: দিল্লিতে না ঢুকে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাখ্যা দিলেন উপদেষ্টা

ভারতের রাজধানী দিল্লিতে পৌঁছেও দেশটিতে প্রবেশ না করে ফিরে আসার সিদ্ধান্তকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও কূটনৈতিক বার্তার প্রশ্ন হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন প্রধানমন্ত্রীর পলিসি ও স্ট্র্যাটেজি বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। তার ভাষ্য, বিষয়টি ব্যক্তিগত নয়; বরং সরকারের একজন প্রতিনিধির প্রতি প্রদর্শিত আচরণের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবেই তিনি ভারতে প্রবেশ না করে ঢাকায় ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

মঙ্গলবার সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে বিস্তারিত বক্তব্য দেন তিনি।

জাহেদ উর রহমান বলেন, তিনি কোনো ব্যক্তিগত সফরে ভারতে যাননি; একটি সরকারি প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিয়ে আন্তর্জাতিক বৈঠকে অংশ নিতে সেখানে গিয়েছিলেন। সেই অবস্থায় বিমানবন্দরে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, সেটিকে তিনি কেবল ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখেননি।

তার ভাষায়, “আমি ব্যক্তি হিসেবে যাইনি, সরকারের একজন প্রতিনিধি হিসেবে গেছি। ফলে আমার সঙ্গে যা হয়েছে, সেটার একটি তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ প্রয়োজন ছিল। সেই কারণেই ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”

তিনি জানান, পরবর্তী সময়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তার প্রবেশের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করলেও তিনি আর সেই সুযোগ গ্রহণ করেননি। কারণ তখন তাঁর কাছে মনে হয়েছে, রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একটি স্পষ্ট বার্তা দেওয়া প্রয়োজন।

‘এটি শেখ হাসিনার সরকার নয়, জনগণের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত সরকার’
ঘটনার রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, বর্তমান সরকারকে দেশের ভেতরে ও বাইরে সবাইকে জনগণের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত সরকার হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।

তিনি বলেন, “একটা মেসেজ দেশ ও দেশের বাইরে যাওয়া দরকার ছিল, এটা শেখ হাসিনার সরকার নয়, এটা জনগণের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত সরকার। জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে আচরণ করার ক্ষেত্রে সেই বাস্তবতাকে মাথায় রাখতে হবে।”

তবে তিনি স্পষ্ট করেন, তার সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য কোনো ধরনের পাল্টাপাল্টি উত্তেজনা বা নেতিবাচক পরিস্থিতি তৈরি করা নয়।

‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির কথাও স্মরণ করালেন
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির প্রসঙ্গ টেনে জাহেদ উর রহমান বলেন, ভারতসহ সব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন ও পারস্পরিক সহযোগিতার পক্ষে সরকার। তবে সেই সম্পর্ক কখনোই দেশের স্বার্থ, মর্যাদা বা আত্মসম্মানের বিনিময়ে হতে পারে না।

তিনি বলেন, “আমাদের অবস্থান খুব পরিষ্কার, সবার আগে বাংলাদেশ। আমরা প্রত্যেক দেশের সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক রাখব। কিন্তু রাষ্ট্রের আত্মমর্যাদা বিসর্জন দিয়ে কোনো সুবিধা আদায়ের নীতি এই সরকারের নয়।”

কূটনৈতিক পাসপোর্ট নয়, অন্য কারণেই জটিলতা
ভারতে প্রবেশে বাধার পেছনে কূটনৈতিক পাসপোর্ট না থাকা দায়ী ছিল, এমন আলোচনাও নাকচ করে দিয়েছেন তিনি। জাহেদ উর রহমান বলেন, তিনি এখনো কূটনৈতিক পাসপোর্ট গ্রহণ করেননি, তবে তার পাসপোর্টে সার্ক স্টিকার ছিল, যা কার্যত একই ধরনের সুবিধা দেওয়ার কথা। তাই কূটনৈতিক পাসপোর্ট না থাকাকে ঘটনার কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

তিনি বলেন, “কূটনৈতিক পাসপোর্ট নেওয়া বাধ্যতামূলক নয়। এটা একটি সুবিধা, চাইলে গ্রহণ করা যায়। কিন্তু এই ঘটনাটির সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই।”

বিমানবন্দরে কী ঘটেছিল?
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জানান, তার নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধি দলের অন্য সদস্যরা স্বাভাবিকভাবেই ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করে বেরিয়ে যান। কিন্তু তার ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটি অস্বাভাবিকভাবে দীর্ঘায়িত হতে থাকে।

তিনি বলেন, ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ করছিলেন এবং বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা চলছিল। পুরো সময় দিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার তার পাশে ছিলেন এবং বিভিন্ন মহলে যোগাযোগ করে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করেন।

জাহেদ উর রহমান বলেন, “প্রায় দুই ঘণ্টা অপেক্ষার পর আমার মনে হয়েছে, এটি গ্রহণযোগ্য নয়। আমি আর প্রবেশ করব না বলে সিদ্ধান্ত নিই। আমার কাছে মনে হয়েছে, রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা একজন প্রতিনিধির প্রতি যে সৌজন্য দেখানো উচিত, সেখানে তার ঘাটতি ছিল।” পরে ভারতীয় সময় রাত সাড়ে ১২টার দিকে তিনি কলম্বো হয়ে ঢাকায় ফেরার ফ্লাইটে ওঠেন।

সম্পর্কের ওপর প্রভাব পড়বে?
এই ঘটনা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে নতুন কোনো চাপ তৈরি করতে পারে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি সংযত অবস্থান নেন। তার মতে, ঘটনাটি দুই দেশের সম্পর্ককে প্রভাবিত করার মতো কোনো বিষয় হওয়া উচিত নয়। তিনি এটিকে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, “এখন বিষয়টি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পর্যায়ে রয়েছে। তারা প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেবে।”

যে বৈঠকে যোগ দিতে গিয়েছিলেন
ডা. জাহেদ উর রহমান রোববার সন্ধ্যায় দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। সেখানে তার নেতৃত্বে বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধি দলের অংশ নেওয়ার কথা ছিল দুই দিনব্যাপী ইন্ডিয়ান ওশান রিম অ্যাসোসিয়েশনের (আইওআরএ) জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বৈঠকে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, বৈঠকে তার অংশগ্রহণের বিষয়টি বাংলাদেশ হাইকমিশন গত শুক্রবারই আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অবহিত করেছিল।

তবে দিল্লি বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন জটিলতায় পড়ে তিনি দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেন। পরে উচ্চপর্যায় থেকে প্রবেশের অনুমতি মিললেও তিনি আর ভারতে প্রবেশ না করে কলম্বো হয়ে ঢাকায় ফেরার সিদ্ধান্ত নেন। সোমবার দুপুরে তিনি দেশে ফিরে আসেন।

ঘটনার পর বিষয়টি কেবল একটি বিমানবন্দর-সংক্রান্ত জটিলতা নয়, বরং কূটনৈতিক প্রটোকল, রাষ্ট্রীয় মর্যাদা এবং পারস্পরিক সম্পর্কের সংবেদনশীলতা নিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *