যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনায় থাকা নতুন সমঝোতার সবচেয়ে আলোচিত দিক হয়ে উঠেছে একটি বিশাল আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ তহবিল। প্রস্তাবিত এই তহবিলের আকার ৩০ হাজার কোটি ডলার, যার লক্ষ্য হবে ইরানের অর্থনীতিতে নতুন বিনিয়োগ প্রবাহ তৈরি করা এবং দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা ও সাম্প্রতিক যুদ্ধের ধাক্কা কাটিয়ে দেশটির উন্নয়ন কার্যক্রমকে গতি দেওয়া।
চুক্তি প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, তহবিলটির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের অর্ধেকেরও বেশি ইতোমধ্যে বিভিন্ন বিনিয়োগকারীর কাছ থেকে প্রতিশ্রুত হয়েছে। তবে চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের আগে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হচ্ছে না।
সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, এই তহবিল মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে একটি দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতার দিকে এগিয়ে নিতে অর্থনৈতিক প্রণোদনা হিসেবে কাজ করবে। এটি কোনো সরকারি সহায়তা কর্মসূচি নয়; বরং সম্পূর্ণ বেসরকারি বিনিয়োগভিত্তিক উদ্যোগ।
গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের পর শুরু হওয়া সংঘাতের পর উভয় দেশ নতুন সমঝোতার পথে এগোয়। গত রোববার দুই পক্ষের কর্মকর্তারা যুদ্ধ বন্ধে একটি রূপরেখা চুক্তিতে নীতিগত সম্মতির কথা জানান। এই সমঝোতার আওতায় ইরানের বন্দরসংক্রান্ত মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার বিষয়ও রয়েছে।
চুক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নতুন তহবিলটি ক্ষতিপূরণ প্রদানের কোনো ব্যবস্থা নয়। যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির জন্য ইরান প্রথমদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ৪০ হাজার কোটি ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করেছিল। কিন্তু ওয়াশিংটন সে প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দেয়। এরপর বিকল্প হিসেবে ‘রিকনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফান্ড’ গঠনের ধারণা সামনে আসে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র, উপসাগরীয় আরব দেশ, এশিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকার বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এ তহবিলে বিনিয়োগ করবে। কোনো রাষ্ট্র সরাসরি অনুদান দেবে না।
ইরানি সূত্রগুলোর দাবি, আঞ্চলিক দেশগুলো বিভিন্নভাবে সহায়তা করতে পারে। কেউ ঋণের গ্যারান্টি দেবে, কেউ অর্থায়ন সহজ করবে, আবার কেউ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প ও অবকাঠামো পুনর্গঠনে অর্থ বিনিয়োগ করবে।
সম্ভাব্য বিনিয়োগের তালিকায় রয়েছে মোবারাকেহ স্টিল কোম্পানির ইস্পাত কারখানা, বিভিন্ন তেল শোধনাগার, বিমানবন্দর এবং যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের জন্য এই ধরনের বিনিয়োগ তহবিল গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ, বিপুল জ্বালানি সম্পদ এবং বড় অভ্যন্তরীণ বাজার থাকা সত্ত্বেও কয়েক দশক ধরে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটি বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে পিছিয়ে রয়েছে।
প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদের দিক থেকে ইরান বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ। তেলের মজুতের ক্ষেত্রেও দেশটির অবস্থান শীর্ষ পর্যায়ে। পাশাপাশি প্রায় ৯ কোটি ২০ লাখ মানুষের বিশাল বাজার, তরুণ জনশক্তি এবং পেট্রোকেমিক্যাল, খনিজ, কৃষি ও পর্যটন খাতের সম্ভাবনাও বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো স্পষ্ট করেছে, এই তহবিলের সঙ্গে বিদেশে জব্দ থাকা ইরানি সম্পদ মুক্ত করা বা মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আলোচনার কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই। এগুলো পৃথক প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বর্তমান ৬০ দিনের সমঝোতা স্মারক কেবল একটি অন্তর্বর্তী রূপরেখা। এই সময়ের মধ্যে পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা চলবে। চূড়ান্ত ও সন্তোষজনক চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত প্রস্তাবিত তহবিল আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হবে না।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, স্থায়ী চুক্তি স্বাক্ষরের পর তহবিলটির প্রশাসনিক কাঠামো গঠন করা হবে। এরপর বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান এবং ইরানি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে কোন কোন প্রকল্পে অর্থায়ন করা হবে, তার বিস্তারিত রূপরেখা নির্ধারণ করা হবে।
এদিকে মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকেও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, ইরান যদি চুক্তির শর্ত মেনে চলে, বিশেষ করে পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ধ্বংস এবং কঠোর আন্তর্জাতিক তদারকি ব্যবস্থায় সম্মতি দেয়, তাহলে দেশটি এই বিশাল তহবিলের সুবিধা পেতে পারে।
সূত্রগুলোর দাবি, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে তহবিলে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। যদিও সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
সব মিলিয়ে, যুদ্ধবিরতির আলোচনার পাশাপাশি এই ৩০ হাজার কোটি ডলারের তহবিল এখন যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক উপাদান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সফল হলে এটি ইরানের অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন পর সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ উদ্যোগে পরিণত হতে পারে।








