দীর্ঘ দুই বছর ধরে বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে আবারও আশার আলো দেখছেন প্রবাসী কর্মী, রিক্রুটিং এজেন্সি ও সংশ্লিষ্টরা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন মালয়েশিয়া সফরকে কেন্দ্র করে দেশটির সঙ্গে জনশক্তি রপ্তানি পুনরায় শুরু হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা জোরালো হয়েছে।
আগামী ২১ থেকে ২২ জুন মালয়েশিয়া সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই তার প্রথম বিদেশ সফর। সফরের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার করা হলেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হিসেবে উঠে আসছে বাংলাদেশের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর প্রশ্ন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে কুয়ালালামপুর সফর করবেন বাংলাদেশের সরকারপ্রধান। ২২ জুন দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে আনুষ্ঠানিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠক শেষে দুটি সমঝোতা স্মারক এবং দুটি ‘নোট অব এক্সচেঞ্জ’ সই হতে পারে।
সরকারি সূত্রগুলো বলছে, বৈঠকে শ্রমবাজার, ভিসা জটিলতা, কনস্যুলার সেবার সীমাবদ্ধতা এবং অনথিভুক্ত বাংলাদেশি কর্মীদের বিভিন্ন সমস্যা গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হবে। বিশেষ করে ২০২৪ সাল থেকে বন্ধ থাকা শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতির আশা করছে ঢাকা।
সরকারের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, মালয়েশিয়া বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার দেশ। বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি সেখানে কর্মরত থাকায় শ্রমবাজার ইস্যু স্বাভাবিকভাবেই সফরের প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
শ্রমবাজারের পাশাপাশি বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি সহযোগিতা, সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, উচ্চশিক্ষা, কৃষি, হালাল খাদ্যশিল্প, সুনীল অর্থনীতি, রোহিঙ্গা সংকট এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতেও আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, সফরটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বল্প সময়ের হলেও এর কৌশলগত গুরুত্ব অনেক। মালয়েশিয়ায় অবস্থানকালে প্রধানমন্ত্রী কয়েকটি বড় ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীদের সঙ্গেও বৈঠক করতে পারেন। জ্বালানি খাতের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
মালয়েশিয়া সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী সরাসরি চীন সফরে যাবেন। ২৩ থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত তিনি সেখানে অবস্থান করবেন।
শ্রমবাজার নিয়ে কেন এত গুরুত্ব?
মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ কার্যক্রম সর্বশেষ বন্ধ হয় ২০২৪ সালের ৩১ মে। দেশটির সরকার তখন জানিয়ে দেয়, পূর্ব অনুমোদনপ্রাপ্ত কর্মীদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রবেশ করতে হবে, এরপর নতুন করে কর্মী ভিসা দেওয়া হবে না।
এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হলেও শ্রমবাজার পুনরায় চালু করা সম্ভব হয়নি। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে আলোচনা শুরু করে।
এপ্রিল মাসে প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন মালয়েশিয়া সফর করে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন। এরপর সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে দ্রুত শ্রমবাজার খোলার বিষয়ে আশাবাদী বক্তব্য দেওয়া হয়েছে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হকও সম্প্রতি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন সফর শ্রমবাজার পুনরায় চালুর ক্ষেত্রে বড় ধরনের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
শ্রমবাজার খুললেও রয়ে গেছে উদ্বেগ
যদিও শ্রমবাজার চালুর সম্ভাবনায় আশাবাদ তৈরি হয়েছে, তবু নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে। রিক্রুটিং এজেন্সি ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করেন, বিদ্যমান সমঝোতা স্মারক অপরিবর্তিত থাকলে অতীতের সিন্ডিকেট ব্যবস্থা আবারও ফিরে আসতে পারে।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বলেন, শ্রমবাজার অবশ্যই খুলতে হবে, তবে সেটি যেন স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়। অন্যথায় আগের মতো কিছু গোষ্ঠীর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
শর্ত পূরণে এজেন্সির তালিকা পাঠিয়েছে বাংলাদেশ
মালয়েশিয়া ২০২৫ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশকে একটি চিঠির মাধ্যমে ১০টি নির্দিষ্ট শর্ত পূরণে সক্ষম রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা চেয়েছিল। শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে, গত পাঁচ বছরে অন্তত ৩ হাজার কর্মী পাঠানোর অভিজ্ঞতা, নিজস্ব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং কমপক্ষে ১০ হাজার বর্গফুট স্থায়ী অফিস স্পেস।
এ ছাড়া বৈধ লাইসেন্স, একাধিক দেশে কর্মী পাঠানোর অভিজ্ঞতা, সুনামের সনদ এবং মানব পাচার বা জোরপূর্বক শ্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট না থাকার মতো শর্তও রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশের মোট ২ হাজার ৫০০ লাইসেন্সধারী রিক্রুটিং এজেন্সির মধ্য থেকে ৪২৩টি প্রতিষ্ঠানের তালিকা মালয়েশিয়ার কাছে পাঠানো হয়েছে।
বাংলাদেশি শ্রমিকদের বড় গন্তব্য
বাংলাদেশ জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৮ সালে প্রথম বাংলাদেশি শ্রমিক মালয়েশিয়ায় যান। দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক জনশক্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় ১৯৯২ সালে।
পরবর্তী সময়ে কয়েক দফায় বাজার বন্ধ ও চালু হলেও মালয়েশিয়া বাংলাদেশি কর্মীদের অন্যতম বড় গন্তব্যে পরিণত হয়। ২০২৩ সালে রেকর্ড ৩ লাখ ৫১ হাজার ৬৮৩ জন বাংলাদেশি কর্মী দেশটিতে যান। তবে ২০২৪ সালের মে মাসে বাজারটি আবার বন্ধ হয়ে যায়।
এখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরকে ঘিরে সেই বন্ধ দুয়ার আবারও খুলবে কি না, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে হাজারো কর্মপ্রত্যাশী এবং সংশ্লিষ্ট খাতের ব্যবসায়ীরা।








