দুই বছর বন্ধ থাকার পর আবারও বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য খুলতে যাচ্ছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। সরকারের আশা, আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যেই কর্মী পাঠানো শুরু হবে এবং তা হবে জিরো কস্ট বা বিনা খরচে। তবে এবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু শুধু শ্রমবাজার চালু নয়, বরং অতীতের সিন্ডিকেট ও দুর্নীতির পুনরাবৃত্তি ঠেকানো।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এবারের সিদ্ধান্ত?
বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের অন্যতম বড় গন্তব্য মালয়েশিয়া। কিন্তু এই বাজারকে ঘিরে বছরের পর বছর ধরে সিন্ডিকেট, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় এবং সীমিতসংখ্যক রিক্রুটিং এজেন্সির আধিপত্যের অভিযোগ ছিল।
সরকার বলছে, এবার সেই কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। এতদিন মালয়েশিয়া বাংলাদেশ থেকে কর্মী পাঠানোর জন্য রিক্রুটিং এজেন্সি নির্বাচন করলেও, নতুন ব্যবস্থায় সেই দায়িত্ব থাকবে বাংলাদেশের হাতে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই পরিবর্তন কার্যকর হলে দীর্ঘদিনের সিন্ডিকেট ভাঙার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
দীর্ঘদিনের অনিয়মের ইতিহাস
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ একাধিকবার বন্ধ হয়েছে। ২০০৮ সালে প্রথমবার বাজার বন্ধ হওয়ার পর ২০১৬ সালে তা পুনরায় চালু হয়। কিন্তু দুর্নীতির অভিযোগে ২০১৮ সালে আবারও বাংলাদেশি কর্মী নেওয়া স্থগিত করে মালয়েশিয়া।
২০২১ সালের ডিসেম্বরে দুই দেশের মধ্যে নতুন সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হলেও বাস্তবে কর্মী পাঠানো শুরু হতে প্রায় তিন বছর সময় লাগে। ২০২২ সালের আগস্টে শ্রমিক যাওয়া শুরু হলেও ২০২৪ সালের ১ জুন আবারও শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকে দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন শর্ত ও নীতিগত বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছিল।
কূটনৈতিক আলোচনায় নতুন অগ্রগতি
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরে শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়টি গুরুত্ব পায়। দুই দেশের সরকারের আলোচনায় আইনি জটিলতা দ্রুত কাটিয়ে ওঠার আশাবাদ ব্যক্ত করেছে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজ (বায়রা)।
সংগঠনটির সাবেক মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী বলেন, দুই সরকার যে পদ্ধতি নির্ধারণ করবে, সেই কাঠামো মেনেই কর্মী পাঠাতে প্রস্তুত রয়েছে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো।
সিন্ডিকেট ঠেকাতে কী চাইছেন সংশ্লিষ্টরা?
জনশক্তি রফতানিকারকদের মতে, শুধু নীতিগত পরিবর্তন যথেষ্ট নয়। সরকার ও রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বায়রার সাবেক সভাপতি মো. গোলাম মোস্তফা বলেন, সরকার যদি রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর প্রতি ইতিবাচক ভূমিকা নেয় এবং যথাযথ স্বীকৃতি দেয়, তাহলে কর্মসংস্থান পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আরও কার্যকরভাবে কাজ করা সম্ভব হবে।
অর্থনীতিবিদদের সতর্কবার্তা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা না নিলে নতুন করে শ্রমবাজার খুললেও কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলবে না।
র্যাপিডের চেয়ারম্যান ড. আব্দুর রাজ্জাকের মতে, কর্মী পাঠানোর প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে অভিবাসন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। তবে এটি পুরোপুরি সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করবে।
সরকার কী বলছে?
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নূরুল হক নূর জানিয়েছেন, যৌথ ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে সমাধান হলে আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যেই বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুলে যেতে পারে।
তিনি বলেন, সরকারের লক্ষ্য হলো কর্মীরা যেন বিনা খরচে মালয়েশিয়ায় যেতে পারেন। একই সঙ্গে এবার রিক্রুটিং এজেন্সি নির্বাচনের দায়িত্ব বাংলাদেশই পালন করবে। এতে অতীতে যেসব সিন্ডিকেটের অভিযোগ উঠেছিল, তা কমে আসবে বলে সরকারের আশা।
প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীও বাংলাদেশ থেকে জিরো কস্টে কর্মী নেওয়ার বিষয়ে সম্মতি দিয়েছেন।
অপেক্ষায় হাজারো কর্মী
২০২৪ সালে শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ৭ হাজার ৮৭৩ জন বাংলাদেশি কর্মী মালয়েশিয়ায় যেতে পারেননি। তাদের পাঠানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সরকারি সংস্থা বোয়েসেলকে।
এ পর্যন্ত প্রায় ৩ হাজার কর্মী মালয়েশিয়ায় যেতে সক্ষম হয়েছেন। বাকি কর্মীদের দ্রুত পাঠানোর জন্য পৃথক সিদ্ধান্ত নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন একটাই
শ্রমবাজার আবার খুলছে, এটি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক খবর। তবে এবারও যদি সিন্ডিকেট, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় এবং অস্বচ্ছতা ফিরে আসে, তাহলে অতীতের সংকট আবারও দেখা দিতে পারে।
তাই শ্রমবাজার পুনরায় চালুর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, এবার সেটি কতটা স্বচ্ছ, ন্যায়সঙ্গত এবং শ্রমিকবান্ধবভাবে পরিচালিত হয়।








