সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬

সবশেষ

প্রক্সি বাহিনীর ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, ঝুঁকিতে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা

মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক সংঘাত যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, ততই বিভিন্ন রাষ্ট্রের প্রক্সি বা মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীর ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষই নিজেদের কৌশলগত লক্ষ্য বাস্তবায়নে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে ব্যবহার করছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্ভরতা অঞ্চলজুড়ে স্থিতিশীলতার পরিবর্তে নতুন করে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সম্প্রতি উপসাগরীয় দেশগুলো সফর শেষে স্বীকার করেন, ওই অঞ্চলের নেতারা ইরানের ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন। তাদের আশঙ্কা, তেহরানের সঙ্গে সম্ভাব্য যুক্তরাষ্ট্রের সমঝোতা হলেও ইরানের প্রক্সি নেটওয়ার্কের বিস্তার থামবে না।

রুবিও জানান, সম্ভাব্য যেকোনো চুক্তিতে শুধু ইরানের পরমাণু কর্মসূচি সীমিত করাই যথেষ্ট নয়। একই সঙ্গে গাজায় হামাস, লেবাননে হিজবুল্লাহ, ইরাকে শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের প্রতি ইরানের সমর্থনও বন্ধ হওয়া জরুরি।

তবে পশ্চিমা নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের ধারণা ভিন্ন। তাদের মতে, সাম্প্রতিক সংঘাতের পর ইরান বরং এসব গোষ্ঠীর প্রতি আরও বেশি সমর্থন দেবে, কারণ তেহরান এখনো তাদের আঞ্চলিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করে।

হিজবুল্লাহকে ঘিরে ইরানের নতুন হিসাব
২০২৪ ও ২০২৫ সালে ইসরায়েলের সঙ্গে দীর্ঘ সংঘর্ষে হিজবুল্লাহ উল্লেখযোগ্য ক্ষতির মুখে পড়লেও ইরান সংগঠনটিকে ছেড়ে দেয়নি। চার দশকের বেশি আগে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সহায়তায় গড়ে ওঠা এই সংগঠন এখনো তেহরানের অন্যতম প্রধান মিত্র।

ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসির সিনিয়র ফেলো হানিন গাদ্দারের মতে, ইরান বর্তমান পরিস্থিতিকে সাময়িক ধাক্কা হিসেবে দেখছে এবং বিশ্বাস করছে, হিজবুল্লাহ আবারও শক্তি সঞ্চয় করতে সক্ষম হবে। তাই এই গোষ্ঠীসহ অন্যান্য প্রক্সি বাহিনীকে পুনর্গঠন এবং তাদের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা এখন তেহরানের অগ্রাধিকার।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান লেবাননের পরিস্থিতিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতির সঙ্গে যুক্ত করে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের ওপরও চাপ সৃষ্টি করতে চাইছে।

হুতি ও ইরাকি মিলিশিয়াদের ভিন্ন কৌশল
ইয়েমেনের হুতিরাও ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও তারা অনেকটাই স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেয়। সাম্প্রতিক সংঘাতে তারা ইসরায়েলে হামলা এবং লোহিত সাগরের জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত করার সক্ষমতা দেখিয়েছে, যদিও সামরিকভাবে বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারেনি।

হানিন গাদ্দারের ভাষায়, হুতিরা অত্যন্ত কট্টরপন্থী এবং নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরাই নেয়; তাদের প্রতিটি পদক্ষেপে ইরানের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ থাকে না।

অন্যদিকে, দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ইরানের সমর্থন পাওয়া ইরাকের শিয়া মিলিশিয়ারা সংঘাতে সীমিতভাবে সক্রিয় ছিল। তারা যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থাপনা ও কুয়েতকে লক্ষ্য করে ড্রোন ও রকেট হামলার দায় স্বীকার করলেও নিজেদের পুরো সামরিক সক্ষমতা ব্যবহার করেনি।

হরাইজন এনগেজের ইরাকি মিলিশিয়া বিশেষজ্ঞ মাইকেল নাইটসের মতে, ইরান তাদের কাছ থেকে আরও বেশি সক্রিয় ভূমিকা প্রত্যাশা করলেও মিলিশিয়াগুলো অতিরিক্ত ঝুঁকি নিতে আগ্রহী ছিল না।

কুর্দিদের ব্যবহার করে ইরানকে চাপে ফেলার পরিকল্পনা
সংঘাতের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের আরব ও বালুচ সংখ্যালঘুদের নিয়ে সশস্ত্র গোষ্ঠী গঠনের চেষ্টা করলেও তা সফল হয়নি।

একইভাবে উত্তর ইরাকের কুর্দি যোদ্ধাদের ব্যবহার করে উত্তর-পশ্চিম ইরানে প্রবেশের একটি পরিকল্পনাও আলোচনায় ছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী, মার্কিন বিশেষ বাহিনীর সহায়তায় কয়েক হাজার কুর্দি যোদ্ধা ইরানে ঢুকে সরকারকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করবে এবং একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলা ইরানি বাহিনীকে দুর্বল করবে।

এই পরিকল্পনা নিয়ে দীর্ঘদিন আলোচনা চললেও বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি। কারণ, পর্যাপ্ত প্রস্তুতির অভাব, কুর্দিদের অনীহা, সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক নীতিতে তাদের অসন্তোষ এবং তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগানের কঠোর বিরোধিতা শেষ পর্যন্ত পরিকল্পনাটি ভেস্তে দেয়।

সিরিয়া ও গাজায়ও প্রক্সি নির্ভরতা
সিরিয়ায় ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো একটি নতুন দ্রুজ সশস্ত্র গোষ্ঠীকে অর্থ, তথ্য ও অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। ইসরায়েল দাবি করছে, সংখ্যালঘু দ্রুজ জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই উদ্যোগ। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এর মাধ্যমে সিরিয়ার নতুন সরকারের কর্তৃত্বও দুর্বল করা হচ্ছে, যা ইসরায়েলের কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

গাজায় হামাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়েও ইসরায়েল একাধিক ফিলিস্তিনি মিলিশিয়া গোষ্ঠীকে কাজে লাগিয়েছে। এসব গোষ্ঠী সীমিত কিছু অভিযানে অংশ নিলেও প্রত্যাশিত ফল আসেনি। বর্তমানে গাজার ৬০ শতাংশের বেশি এলাকা ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও বাকি অঞ্চলে প্রভাব ধরে রেখেছে হামাস।

তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্লেষক ও সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা মাইকেল মিলশটেইনের মতে, এসব মিলিশিয়ার জনসমর্থন অত্যন্ত কম এবং তারা কখনোই হামাসের কার্যকর বিকল্প হয়ে উঠতে পারবে না।

প্রক্সি যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে সতর্কতা
বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোকে শক্তিশালী করা এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে নিরস্ত্র করা জরুরি। কিন্তু বাস্তবে বিভিন্ন আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তি এখনো প্রক্সি বাহিনীকে কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে যাচ্ছে।

সিরিয়া, লিবিয়া ও সুদানের মতো চলমান সংঘাতগুলোও সেই প্রবণতারই উদাহরণ।

মাইকেল মিলশটেইনের মূল্যায়ন, প্রক্সি বাহিনী স্বল্পমেয়াদে কিছু সুবিধা দিলেও দীর্ঘমেয়াদে তারা নির্ভরযোগ্য নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও অস্থিতিশীল করে তোলে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *