কাতারের উপহার হিসেবে পাওয়া নতুন ‘এয়ারফোর্স ওয়ান’ উড়োজাহাজ আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যবহারের পর আবারও আলোচনায় এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরকারি বিমান বহর। প্রায় ৪০ কোটি ডলার মূল্যের বিলাসবহুল বোয়িং ৭৪৭-৮আই (ভিসি-২৫বি ব্রিজ) উড়োজাহাজটি নিয়ে যেমন প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও আভিজাত্যের আলোচনা হচ্ছে, তেমনি এর উপহার গ্রহণকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বিতর্কও থামেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বুধবার নর্থ ডাকোটা সফরে এই উড়োজাহাজে প্রথমবার যাত্রা করেন ট্রাম্প। সফরে রওনা হওয়ার আগে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, নতুন উড়োজাহাজে প্রথমবার ভ্রমণ করতে পেরে তিনি অত্যন্ত উচ্ছ্বসিত।
ট্রাম্পের ভাষ্য, এমন মানের একটি উড়োজাহাজ যুক্তরাষ্ট্র নিজেই তৈরি করতে পারত না। তার দাবি, এটি নির্মাণে যে বিপুল ব্যয় প্রয়োজন, তা বহনে যুক্তরাষ্ট্র রাজি হতো না, কিন্তু কাতার সর্বোচ্চ মান নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যয় করেছে।
মূলত কাতারের রাজপরিবারের ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হয়েছিল বিলাসবহুল এই বোয়িং ৭৪৭-৮আই। পরে সেটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের ব্যবহারের জন্য উপহার হিসেবে দেওয়া হয়। প্রেসিডেন্টের উপযোগী করতে উড়োজাহাজটিতে বিস্তৃত নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত সংস্কার করা হয়েছে। আভিজাত্যপূর্ণ অভ্যন্তরীণ নকশা ও যাত্রীসুবিধা আগেই থাকলেও এখন এতে যুক্ত হয়েছে প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষ সুরক্ষা ব্যবস্থা।
কেবিন সম্পূর্ণ নতুনভাবে নির্মাণ না করে বিশেষজ্ঞ নিরাপত্তা দল পুরো উড়োজাহাজের প্রযুক্তিগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে সম্ভাব্য ঝুঁকি দূর করেছে। এরপর এতে আধুনিক নিরাপত্তা ও যোগাযোগব্যবস্থা সংযোজন করা হয়।
উড়োজাহাজটিতে বহুমাত্রিক নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে ইলন মাস্কের স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেটও রয়েছে। ফলে আকাশে অবস্থান করেও প্রেসিডেন্ট প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবেন। পাশাপাশি প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আরও উন্নত করায় এটি উচ্চঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশেও নিরাপদে পরিচালনার উপযোগী হয়েছে।
ট্রাম্প বলেন, প্রেসিডেন্টের ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের নিরাপত্তা ও আধুনিক সুবিধা এতে যুক্ত করা হয়েছে। তার মতে, পুরো প্রক্রিয়াটি জটিল হলেও চূড়ান্ত ফলাফল অসাধারণ।
তবে কাতারের কাছ থেকে এত মূল্যবান উড়োজাহাজ গ্রহণের সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। নৈতিকতা, সংবিধান এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে নানা প্রশ্ন তোলেন সমালোচকরা। যদিও ট্রাম্প এসব সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করে বলেন, এত বড় একটি উপহার ফিরিয়ে দেওয়া ‘চরম বোকামি’ হতো।
শুরুতে উড়োজাহাজটি পেন্টাগনের জন্য উপহার হিসেবে গ্রহণ করা হলেও পরে ট্রাম্প জানান, প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার দায়িত্ব শেষ হলে এটি তিনি নিজের প্রেসিডেনশিয়াল সংরক্ষণাগারে দান করবেন। এই ঘোষণাও নতুন বিতর্কের সৃষ্টি করে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টদের বহরে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত এয়ারফোর্স ওয়ানের বয়স প্রায় ৩৫ বছর। বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্রনেতারা আধুনিক উড়োজাহাজ ব্যবহার করলেও পুরোনো বিমান ব্যবহারে অসন্তুষ্ট ছিলেন ট্রাম্প। সে কারণেই তিনি কাতারের রাজপরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে উড়োজাহাজটি বিনা মূল্যে উপহার হিসেবে পাওয়ার উদ্যোগ নেন।
এর আগে, ২০১৮ সালে বোয়িংয়ের সঙ্গে দুটি নতুন ৭৪৭-৮ উড়োজাহাজ নির্মাণের চুক্তি করে যুক্তরাষ্ট্র সরকার। তবে ব্যয় বৃদ্ধি ও বিভিন্ন জটিলতার কারণে প্রকল্পটি এখনও শেষ হয়নি। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, নতুন ভিসি-২৫বি বহরে যুক্ত হতে আরও অন্তত দুই বছর সময় লাগতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, নতুন ‘ভিসি-২৫বি ব্রিজ’ উড়োজাহাজটি আনা হয়েছে পুরোনো ভিসি-২৫এ বহরের ওপর চাপ কমানোর জন্য। একই সঙ্গে স্থায়ীভাবে নতুন বোয়িং ভিসি-২৫বি যুক্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রেসিডেন্টের আকাশপথে যাতায়াত নির্বিঘ্ন রাখতে এটি ব্যবহৃত হবে।
গত মাসের শেষ দিকে মেরিল্যান্ডের জয়েন্ট বেজ অ্যান্ড্রুজে উড়োজাহাজটি আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচন করা হয়। তখন এটিকে বিশ্বের সবচেয়ে বিলাসবহুল সরকারি ভিভিআইপি উড়োজাহাজগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।








