কুয়েতের জেলিব আল-শুয়ুখ এলাকায় পরিচালিত বৃহৎ উচ্ছেদ ও নিরাপত্তা অভিযানের ফলে হাজারো প্রবাসী আকস্মিকভাবে বাসস্থান হারিয়েছেন। তীব্র গরম ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির মধ্যে অনেক শ্রমিক ও তাদের পরিবার খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতে বাধ্য হয়েছেন। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশিদের সঙ্গে দেখা করেছে দেশটিতে নিযুক্ত বাংলাদেশ দূতাবাসের একটি প্রতিনিধি দল।
কুয়েতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে সেনাবাহিনী, ন্যাশনাল গার্ড, কুয়েত ফায়ার ফোর্স, বিদ্যুৎ ও পানি মন্ত্রণালয়, পৌরসভাসহ মোট ১১টি সরকারি সংস্থা যৌথভাবে এ অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানের অংশ হিসেবে ঝুঁকিপূর্ণ ও বিধিবহির্ভূত ভবন খালি করা, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা, আবাসিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বিভিন্ন আইন লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
সরকারের ভাষ্য, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই ধরনের অভিযান পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য এলাকাতেও পরিচালনা করা হবে।
তবে ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসীদের অভিযোগ, গভীর রাতে কার্যকর কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই ভবন ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। পাশাপাশি তাৎক্ষণিকভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ায় নারী, শিশু ও বৃদ্ধসহ অসংখ্য মানুষ বিপাকে পড়েন এবং অনেক পরিবারকে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতে হয়।
তাদের দাবি, চলতি মাসের ১০ জুলাই বাড়ির মালিকরা পুরো মাসের ভাড়া নিয়েছেন। কিন্তু ভবন উচ্ছেদ বা পরিত্যক্ত ঘোষণা করার বিষয়টি আগে থেকে জানানো হয়নি। পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হলে তারা বিকল্প বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে পারতেন বলেও জানান তারা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্থানীয় অনলাইন ফোরামেও একই ধরনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন অনেক বাসিন্দা। তাদের ভাষ্য, রাত দুইটা থেকে তিনটার মধ্যে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা পরিচয়পত্র যাচাই করে দ্রুত ভবন খালি করার নির্দেশ দেন। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর ছোট শিশু ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অনেকেই রাস্তায় অবস্থান করতে বাধ্য হন।
অন্যদিকে কুয়েত সরকারের দাবি, এটি কোনো আকস্মিক সিদ্ধান্ত নয়। দীর্ঘদিন ধরেই জেলিব আল-শুয়ুখ এলাকার অনেক ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত ছিল। ২০২৫ সালে ৬৭টি ভবন খালি করে ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে ২০২৬ সালেও আরও ৪২টি ভবন অপসারণের কার্যক্রম শুরু হয়। সরকারের দাবি, উচ্ছেদের আগে নোটিশ প্রদান, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন এবং প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
হঠাৎ উচ্ছেদের কারণে বহু শ্রমিক কর্মস্থল, পরিবার ও ব্যক্তিগত মালামাল নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। অনেকের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও ব্যক্তিগত জিনিসপত্র ভবনের ভেতরেই রয়ে গেছে।
কুয়েত টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসী ও তাদের পরিবারের জন্য সরকার অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র চালু করেছে। তবে এসব আশ্রয়কেন্দ্রের ধারণক্ষমতা এবং সেখানে সহজে পৌঁছানোর সুযোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেক প্রবাসী।
এদিকে শুক্রবার (১৭ জুলাই) বাংলাদেশ দূতাবাসের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা বাংলাদেশি নাগরিকদের খোঁজখবর নিতে দূতাবাসের একটি প্রতিনিধি দল সেখানে যায়। দূতাবাসের কাউন্সেলর ও মিশন প্রধান মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান এবং শ্রম কল্যাণ শাখার কাউন্সেলর শোয়াইব-উল-ইসলাম তরফদারের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলটি প্রবাসীদের সঙ্গে কথা বলে তাদের পরিস্থিতি সম্পর্কে জানে এবং স্থানীয় কুয়েতি কর্মকর্তাদের সঙ্গেও বৈঠক করে।
বৈঠকে কুয়েতি কর্মকর্তারা জানান, মেয়াদোত্তীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন অপসারণের পাশাপাশি অবৈধভাবে অবস্থানরত বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেই এ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। একই ধরনের অভিযান ভবিষ্যতে দেশটির অন্যান্য এলাকাতেও চালানো হবে।








