সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬

সবশেষ

কীভাবে শনাক্ত হলেন জিয়াউর রহমানের হত্যাকারী, কী বলছে ট্রাইব্যুনাল?

সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলায় দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে পলাতক থাকা সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেনকে শনাক্ত করার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে ওঠে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের একটি তদন্ত। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার সাবেক সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর মোবাইল ফোনের ফরেনসিক বিশ্লেষণ থেকেই তার অবস্থানের সূত্র মেলে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা শনিবার এ তথ্য জানিয়েছেন।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, তদন্তের অংশ হিসেবে মাসুদ উদ্দিনের মোবাইল ফোনের ফরেনসিক পরীক্ষা এবং কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) বিশ্লেষণ করা হয়। এতে ২০২৩ সাল থেকে রাজধানীর বনানী ও মিরপুর ডিওএইচএস এলাকার একই লোকেশন থেকে এক ব্যক্তি একাধিক মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে মাসুদ উদ্দিনের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত ফোনালাপ ও এসএমএস আদান-প্রদান করেছেন বলে তথ্য পাওয়া যায়।

পরে তদন্তে দেখা যায়, ব্যবহৃত সিমগুলো ভুয়া পরিচয়ে নিবন্ধিত। ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশন ওই নম্বরগুলোর ব্যবহারকারীকে শনাক্ত করতে না পারায় সেগুলো পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো হয়। এরপর পুলিশের তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, নম্বরগুলো ব্যবহার করছিলেন জিয়াউর রহমান হত্যা মামলায় অভিযুক্ত ও দীর্ঘদিন পলাতক থাকা মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেন।

তানভীর হাসান জোহা বলেন, সন্দেহজনক নম্বরগুলো চিহ্নিত করা পর্যন্তই ট্রাইব্যুনালের কাজ ছিল। এরপর প্রকৃত শনাক্তকরণ ও গ্রেপ্তারের কাজ পুলিশই করেছে।

এর আগে, গত ২৩ মার্চ রাতে রাজধানীর বারিধারা ডিওএইচএসের বাসা থেকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পরে ৭ মে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ ওই মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর পাশাপাশি জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেয়।

অন্যদিকে, গত বুধবার রাতে রাজধানীর বনানীর একটি বাসা থেকে মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেনকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। পরদিন তাকে যথাযথ আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ঢাকা সেনানিবাসের মিলিটারি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই মোজাফফর আত্মগোপনে ছিলেন। গোয়েন্দা তথ্য ও প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে তার অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার পর অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তার পরিচয় নিশ্চিত হলে বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে আর্মড ফোর্সেস ডিভিশনকে জানানো হয়।

১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান একদল বিদ্রোহী সেনা কর্মকর্তার হাতে নিহত হন। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনা, বই ও প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ওই অভিযানে অংশ নেওয়া সেনা কর্মকর্তাদের একজন ছিলেন মেজর মোজাফফর হোসেন। অভিযোগ রয়েছে, হত্যাকাণ্ডের সময় তিনি ঘটনাস্থলেই উপস্থিত ছিলেন। পরে তিনি পালিয়ে যান এবং তাকে ধরিয়ে দিতে পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়েছিল।

এদিকে, মেজর মোজাফফরের গ্রেপ্তারের পর জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড নতুন করে তদন্তের দাবি জোরালো হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৮১ সালে যে বিচার হয়েছিল, সেটি মূলত সেনা বিদ্রোহের বিচার ছিল; জিয়াউর রহমান হত্যার পৃথক বিচার হয়নি। ফলে বেসামরিক আদালতে নতুন করে হত্যা মামলা হলে ঘটনার অজানা অনেক তথ্য সামনে আসতে পারে।

বাংলাদেশ ডিফেন্স জার্নালের সম্পাদক আবু রূশদ দাবি করেন, হত্যাকাণ্ডের পর মেজর মোজাফফর ভারতে পালিয়ে গিয়ে ‘বিপ্লব সরকার’ ও ‘জয় ব্যানার্জী’ নামে ভুয়া পরিচয়ে পাসপোর্ট তৈরি করেন এবং সেই পাসপোর্ট ব্যবহার করে কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করেন। তিনি আরও বলেন, সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও বীর বিক্রম জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী তার বইয়ে উল্লেখ করেছেন, থাইল্যান্ডে রাষ্ট্রদূত থাকাকালে মেজর মোজাফফর ও মেজর খালেদ তার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন।

আবু রূশদের দাবি, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর মোজাফফর বাংলাদেশে ফিরে ভিন্ন পরিচয়ে বসবাস শুরু করেন। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার আগে তিনি আবার দেশ ছাড়েন। পরে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় এলে আবার দেশে ফিরে আসেন।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা ব্যারিস্টার এম. সারোয়ার হোসেন বলেন, সেনা বিদ্রোহ ও জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড দুটি পৃথক বিষয়। তাই হত্যাকাণ্ডের বিচার বেসামরিক কিংবা সামরিক আদালতেই হতে পারে। কোন আদালতে বিচার হবে, সেটি সরকারের সিদ্ধান্তের বিষয়।

বিশ্লেষকদের মতে, মেজর মোজাফফরকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের পেছনের ঘটনা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। তবে সেসব তথ্যকে ইতিহাসের অংশ হিসেবে গ্রহণের আগে অন্যান্য দলিল, প্রমাণ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যের সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *