মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

সবশেষ

এক বছর পরও বিচার-জবাবদিহির অপেক্ষায় মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির পরিবারগুলো

এক বছর পেরিয়ে গেলেও রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়ির মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় নিহত ও আহত শিক্ষার্থীদের পরিবারের ক্ষত এখনো শুকায়নি। তাদের অভিযোগ, তদন্ত হয়েছে, সুপারিশও এসেছে, আদালতেও বিষয়টি রয়েছে; কিন্তু দায় নির্ধারণ, বিচার, পর্যাপ্ত পুনর্বাসন এবং ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপের কোনোটিই দৃশ্যমান হয়নি। তাই তাদের একটাই দাবি, ঘটনার সুষ্ঠু বিচার এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা।

গত বছরের ২১ জুলাই মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ক্যাম্পাসে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হলে ২৮ জন শিক্ষার্থী, তিনজন শিক্ষক, তিনজন অভিভাবক, একজন আয়া এবং যুদ্ধবিমানটির পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলামসহ মোট ৩৫ জন নিহত হন। দুর্ঘটনার পর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নেন ৮০ জন এবং জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয় ৫৭ জনকে।

নিহতদের একজন ছিল তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী বোরহান উদ্দিন বাপ্পি। তার মা বীথি আক্তার স্মৃতিচারণ করে বলেন, সকালে নিজ হাতে ছেলেকে স্কুলে পৌঁছে দিয়েছিলেন। দুপুরে টিফিনও দিয়ে এসেছিলেন। এরপর হাসপাতালে ছেলের নিথর দেহই ফিরে পান। দগ্ধ হওয়ার কারণে সন্তানের মুখ পর্যন্ত ঠিকভাবে চিনতে পারেননি। তার ভাষায়, সন্তানের মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।

বোরহানের ছোট ভাই হজরত বেলাল উদ্দিন বিজয়ও একই ক্যাম্পাসে প্লে শ্রেণিতে পড়ত। বড় ভাইয়ের স্মৃতি প্রতিনিয়ত তাড়া করে বলে তাকে অন্য একটি বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়েছেন পরিবার।

একই ঘটনায় নিহত হয় আপন ভাই-বোন তাহিয়া আশরাফ নাজিয়া ও আরিয়ান আশরাফ নাফি। ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী নাজিয়ার শরীরের প্রায় ৯০ শতাংশ এবং তৃতীয় শ্রেণির নাফির প্রায় পুরো শরীরই দগ্ধ হয়েছিল বলে জানান তাদের বাবা আশরাফুল ইসলাম।

দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী নাভিদ নাওয়াজ দীপ্ত টানা ৯৭ দিন বার্ন ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন ছিল। শুরুতে ১০ দিন লাইফ সাপোর্টে রাখার পর আইসিইউ, এইচডিইউ এবং কেবিনে চিকিৎসা চলে। তার শরীরে ৩৬টি অস্ত্রোপচার এবং আটবার স্কিন গ্রাফটিং করা হয়। গত বছরের ২৭ অক্টোবর বাসায় ফিরলেও এখনো নিয়মিত চিকিৎসা নিতে হচ্ছে তাকে।

আহত শিক্ষার্থীদের অনেকেই এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি। পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী রুপি বড়ুয়া রয়া তিন মাস হাসপাতালে ভর্তি ছিল। দগ্ধ হওয়ার কারণে তার হাতের আঙুলগুলো প্রায় জোড়া লেগে গেছে। বর্তমানে সে ষষ্ঠ শ্রেণিতে উঠলেও স্কুলে যেতে পারে না। বাসায় শিক্ষক গিয়ে তাকে পড়ান।

রুপি বড়ুয়ার বড় বোন একা বড়ুয়া বলেন, দুর্ঘটনার পর পুরো পরিবারের জীবন বদলে গেছে। বোনের সার্বক্ষণিক দেখাশোনা করতে গিয়ে নিজের পড়াশোনা ও চাকরির পরিকল্পনা স্থগিত রাখতে হয়েছে। রুপির একা চলাফেরা বা বাথরুমে যাওয়াও সম্ভব হয় না। অন্যদিকে পরিবারের আরেক বোনও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার পর উচ্চশিক্ষায় ভর্তি হতে পারেনি। চিকিৎসার ব্যয়ও দিন দিন বাড়ছে। তার প্রশ্ন, এই ক্ষতির দায় কে নেবে?

আরেক আহত শিক্ষার্থী কাফি আহমেদ তাইফ ৭০ দিন বার্ন ইনস্টিটিউটে চিকিৎসা নেয়। তার বাবা মেরাজ আহমেদ জানান, সরকারি খরচে চিকিৎসা হলেও ওষুধ, খাবার এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে পরিবারের কয়েক লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। এখনো নিয়মিত ফলোআপ চলছে। শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও ছেলে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে এবং নিজের পরিবর্তিত চেহারা মেনে নিতে পারছে না।

দুর্ঘটনার পর ২৭ জুলাই নয় সদস্যের একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। কমিশন যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার কারণ, দায়দায়িত্ব, ক্ষয়ক্ষতি এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো খতিয়ে দেখে। তিন মাস পর, গত ৫ নভেম্বর, প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়।

পরে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, তদন্ত কমিশন ১৫০ জনের সাক্ষ্য নিয়েছে, ১৬৮টি তথ্য উদ্ঘাটন করেছে এবং ৩৩টি সুপারিশ দিয়েছে। তদন্তে দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে পাইলটের উড্ডয়নজনিত ত্রুটির কথা উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে বলা হয়, মাইলস্টোন স্কুলের ভবনটি রাজউকের বিল্ডিং কোড অনুযায়ী অনুমোদিত ছিল না। বিধি অনুযায়ী ভবনটিতে অন্তত তিনটি সিঁড়ি থাকার কথা থাকলেও ছিল মাত্র একটি। কমিশনের মতে, প্রয়োজনীয় সিঁড়ি থাকলে হতাহতের সংখ্যা আরও কম হতে পারত।

কমিশনের অন্যতম প্রধান সুপারিশ ছিল জননিরাপত্তার স্বার্থে বিমানবাহিনীর সব প্রাথমিক প্রশিক্ষণ ঢাকার বাইরে সরিয়ে নেওয়া।

তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ এবং ভবন অনুমোদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগে গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) ও ভুক্তভোগী কয়েকটি পরিবার হাইকোর্টে রিট করে। গত ৮ মার্চ আদালত রুল জারি করে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ, ভুক্তভোগীদের অনুলিপি প্রদান এবং আহত ও নিহতদের পরিবারকে পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ না দেওয়ার বিষয়ে সরকারের ব্যাখ্যা জানতে চান।

এর আগে, ২০২৫ সালের ২২ জুলাই সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. আনিসুর রহমান রায়হানও একই ঘটনায় পৃথক একটি রিট করেন। সেই মামলায় ভুক্তভোগী পরিবারের ১১ সদস্য পক্ষভুক্ত হয়েছেন। আইনজীবী আমিরুল হক জানান, দুটি রিটই বর্তমানে হাইকোর্টে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।

দুর্ঘটনার পর বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) প্রকাশিত এক অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়, মাইলস্টোন স্কুল কারিগরিভাবে বৈধ হলেও এটি হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অ্যাপ্রোচ এরিয়ার মধ্যে অবস্থিত। সংস্থাটির মতে, এ ধরনের এলাকায় অবস্থিত স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসাসহ জনসমাগম হয়, এমন প্রতিষ্ঠানগুলো নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করা উচিত।

এদিকে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ গত ৩ জুন জানায়, নিহতদের প্রতিটি পরিবারকে ২০ লাখ টাকা এবং আহতদের পরিবারকে ৫ লাখ টাকা করে এককালীন আর্থিক সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে ভুক্তভোগী পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, বাস্তব ক্ষতির তুলনায় এই অর্থ অপর্যাপ্ত। এ কারণে তারা ক্ষতিপূরণের পরিমাণ পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন। বিভাগটির চিঠিতে উল্লেখ ছিল, ২৫ জুনের মধ্যে অর্থ ছাড় না হলে তা সরকারি কোষাগারে ফেরত যাবে।

মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের উপদেষ্টা কর্নেল (অব.) নুরন্ নবী বলেন, আহত শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই আবার স্কুলে ফিরেছে। যারা আসতে পারছে না, তাদের বাড়িতে শিক্ষক পাঠিয়ে পাঠদান চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি তারা বিনা মূল্যে পড়াশোনা ও ফিজিওথেরাপির সুবিধা পাচ্ছে।

তবে নিহত তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ফাতেমা আক্তারের মামা, সাংবাদিক লিওন মীর বলেন, নিহত ও আহতদের পরিবার ঘোষিত ক্ষতিপূরণের অর্থ গ্রহণ করতে আগ্রহী নয়। তাদের দাবি, সন্তানের প্রাণহানির মূল্য অর্থ দিয়ে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তারা চান, আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করে বিচার নিশ্চিত করা হোক এবং দায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *