মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬

সবশেষ

২৬ টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক: বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের নির্দেশ হাইকোর্টের

দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া বিভিন্ন ব্র্যান্ডের টুথপেস্টে ক্ষতিকর মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্তে তিন সদস্যের বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। কমিটিতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), বাংলাদেশ বিজ্ঞান শিল্প গবেষণা পরিষদের (সায়েন্স ল্যাবরেটরি) একজন করে বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) একজন প্রতিনিধি রাখতে বলা হয়েছে।

মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) বিচারপতি খিজির আহমেদ চৌধুরী ও বিচারপতি মো. জিয়াউল হকের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। স্বাস্থ্য সচিব ও বিএসটিআই কর্তৃপক্ষকে কমিটি গঠন করে ১৫ দিনের মধ্যে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

একইসঙ্গে টুথপেস্টে ক্ষতিকর মাইক্রোপ্লাস্টিকের ব্যবহার বা উপস্থিতি ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে সংশ্লিষ্টদের প্রতি রুল জারি করেছেন আদালত।

রিটের পক্ষে শুনানি করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. আবদুল্লাহ আল মামুন।

এর আগে সোমবার (২৭ জুলাই) দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া ৩৪টি টুথপেস্টের মধ্যে ২৬টিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়ার ঘটনায় তদন্ত চেয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন একই আইনজীবী। রিটে স্বাস্থ্য সচিব, পরিবেশ সচিব, বাণিজ্য সচিব, বিএসটিআইসহ সংশ্লিষ্টদের বিবাদী করা হয়।

রিটের ভিত্তি ছিল এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (ইএসডিও) প্রকাশিত একটি গবেষণা। সেখানে বলা হয়, পরীক্ষা করা ৩৪টি টুথপেস্টের মধ্যে ২৬টিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। প্রতি ১০০ গ্রাম টুথপেস্টে ২০ থেকে ৩২০টি পর্যন্ত ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা শনাক্ত হয়েছে। শিশুদের জন্য তৈরি ছয়টি টুথপেস্টের মধ্যে চারটিতেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি মিলেছে।

ইএসডিওর গবেষকদের ভাষ্য, টুথপেস্টে কোনোভাবেই মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকা উচিত নয়। এটি মানবস্বাস্থ্য ও পরিবেশ—উভয়ের জন্যই সম্ভাব্য ঝুঁকির কারণ হতে পারে।

‘মাইক্রোপ্লাস্টিকস ইন টুথপেস্ট: সায়েন্টিফিক এভিডেন্স ফর পলিসি অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাকশন ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণাটি গত রোববার (২৬ জুলাই) রাজধানীর লালমাটিয়ায় ইএসডিওর কার্যালয়ে প্রকাশ করা হয়।

২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত পরিচালিত এ গবেষণায় বাংলাদেশ, ভারত, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে উৎপাদিত ১৯টি ব্র্যান্ডের ৩৪টি টুথপেস্ট পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে দেশে উৎপাদিত ২৫টি নমুনার ২২টিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়। ভারতের পাঁচটির মধ্যে একটিতে, থাইল্যান্ডের দুটি নমুনার একটিতে এবং ভিয়েতনামে উৎপাদিত দুটি নমুনার দুটিতেই এ কণা শনাক্ত হয়।

পরীক্ষা করা ছয়টি শিশুদের টুথপেস্টের মধ্যে চারটিতে প্রতি ১০০ গ্রামে ২০ থেকে ১৪০টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে।

গবেষণার ফল তুলে ধরে ইএসডিওর রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি অ্যাসোসিয়েট ড. ফয়জুন নাহার জানান, খুচরা দোকান, সুপারমার্কেট ও পাইকারি বাজার থেকে সংগ্রহ করা নমুনাগুলো জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরি অব এনভায়রনমেন্টাল হেলথ অ্যান্ড ইকোটক্সিকোলজিতে পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষিত নমুনার ৭৬ দশমিক ৫ শতাংশে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে, আর আটটি নমুনায় শনাক্তযোগ্য মাত্রায় এ ধরনের কণা পাওয়া যায়নি।

গবেষণায় সবচেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে ‘মেডিপ্লাস ফ্লোরাইড জেল’-এ। প্রতি ১০০ গ্রামে এতে ৩২০টি কণা শনাক্ত হয়েছে। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৩৫ দশমিক ৬ শতাংশ এই টুথপেস্ট ব্যবহার করেন, যা সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ব্র্যান্ড হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া ‘ক্লোজ আপ রেড হট’ ও ‘ক্লোজআপ মেন্থল ফ্রেশ’-এ প্রতি ১০০ গ্রামে ১৬০টি করে, ‘কোডোমো আলট্রা শিল্ড ফর্মুলা’ (স্ট্রবেরি)-তে ১৪০টি, ‘সিগন্যাল গ্রিন টি’-তে ১২০টি এবং ‘পেপসোডেন্ট অ্যাডভান্স সল্ট’ ও ‘হিমালয়া কমপ্লিট কেয়ার’-এ ১০০টি করে মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে।

‘সেনসোডাইন ফ্রেশ মিন্ট’-এ ৮০টি এবং ‘পেপসোডেন্ট সেনসিটিভ এক্সপার্ট’, ‘হোয়াইট প্লাস রেড’, ‘হোয়াইট প্লাস প্রো সেনসিটিভ জেল’, ‘সিগন্যাল হোয়াইটেনিং’, ‘মেরিল বেবি’ (স্ট্রবেরি) ও ‘মেডিপ্লাস টিজিপি ফর্মুলা’-য় ৬০টি করে কণা শনাক্ত হয়েছে।

এ ছাড়া ‘এএম.পিএম. হারবাল’, ‘মেডিপ্লাস ডিএস’, ‘পেপসোডেন্ট জার্মিচেক’, ‘মেরিল বেবি’ (অরেঞ্জ), ‘ম্যাজিক হারবাল’, ‘মেসওয়াক’ এবং ‘ক্লোজআপ মেন্থল ফ্রেশ স্যাশেট’-এ ৪০টি করে কণা পাওয়া গেছে।

‘ডেন্টিন জেল’, ‘পেপসোডেন্ট কিডস’ (অরেঞ্জ), ‘ক্লোজআপ লেমন সি সল্ট’, ‘ব্রাশ আপ হোয়াইটেনিং জেল’ ও ‘হোয়াইট প্লাস প্রো সেনসিটিভ’-এ প্রতি ১০০ গ্রামে ২০টি করে মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা শনাক্ত হয়েছে।

মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া শিশুদের টুথপেস্টগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘কোডোমো আলট্রা শিল্ড ফর্মুলা’ (স্ট্রবেরি), ‘মেরিল বেবি’ (স্ট্রবেরি), ‘মেরিল বেবি’ (অরেঞ্জ) এবং ‘পেপসোডেন্ট কিডস’ (অরেঞ্জ)।

অন্যদিকে আটটি টুথপেস্টে শনাক্তযোগ্য মাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়নি। এগুলো হলো, ‘প্যারোডন্ট্যাক্স এক্সপার্ট গাম কেয়ার’, ‘জেনফ্রেশ’, ‘প্যারাস্যুট জাস্ট ফর বেবি’ (ম্যাঙ্গো), ‘সেনসোডাইন ফ্রেশ জেল’, ‘কোলগেট ম্যাক্সফ্রেশ’, ‘ক্লোজআপ রেড হট জিঙ্ক ফ্রেশ টেকনোলজি’, ‘কোডোমো’ (অরেঞ্জ) এবং ‘কোলগেট অ্যাকটিভ সল্ট’। এর মধ্যে ‘কোডোমো’ (অরেঞ্জ) ও ‘প্যারাস্যুট জাস্ট ফর বেবি’ (ম্যাঙ্গো) শিশুদের জন্য তৈরি টুথপেস্ট।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *