বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬

সবশেষ

মুসলিম নেতার প্রতিষ্ঠিত মোহাম্মদ আলী বিশ্ববিদ্যালয় ভাঙতে উঠেপড়ে লেগেছে বিজেপি সরকার

উত্তর প্রদেশের রামপুরে অবস্থিত মোহাম্মদ আলী জওহর বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০টি ভবনের মধ্যে ৩৮টিকে ‘অবৈধ’ ঘোষণা করে ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেওয়ার পর কয়েক সপ্তাহ ধরে ক্যাম্পাসের বাইরে অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীরা। তাদের অভিযোগ, এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয় নয়, হাজারো শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনও অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে।

রামপুর জেলা প্রশাসন গত ১৫ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেয়, প্রযোজ্য নির্মাণবিধি না মানার অভিযোগে চিহ্নিত ভবনগুলো ৫ আগস্টের মধ্যে নিজেদের উদ্যোগে অপসারণ করতে হবে। অন্যথায় প্রশাসন বুলডোজার দিয়ে ভবন ভেঙে ফেলবে এবং পুরো ব্যয়ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেই আদায় করা হবে।

যদিও পরে প্রশাসন একটি অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ জারি করেছে, তবে সেটি ভবন ভাঙার সিদ্ধান্ত পুরোপুরি বাতিল করেছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য জহিরউদ্দিন বলেন, এই স্থগিতাদেশ কেবল নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে ভাঙার কার্যক্রম স্থগিত করেছে। এখন তাদের লক্ষ্য আদালতের মাধ্যমে পুরো ভাঙার আদেশ বাতিল করা।

স্বাধীনতা সংগ্রামীর নামে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়
ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামী মোহাম্মদ আলী জওহরের নামে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলেন সমাজবাদী পার্টির প্রবীণ নেতা আজম খান। তিনি ২০০৩ সালে মোহাম্মদ আলী জওহর ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠা করেন এবং তিন বছর পর বিশ্ববিদ্যালয়টির যাত্রা শুরু হয়।

বর্তমানে প্রায় ২৫০ একরজুড়ে বিস্তৃত এই ক্যাম্পাসে বিভিন্ন বিষয়ে প্রায় তিন হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন।

প্রশাসনের অভিযোগ কী?
রামপুর ডেভেলপমেন্ট অথরিটির (আরডিএ) দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ ভবন প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই নির্মিত হয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত মেডিক্যাল কলেজসহ মাত্র দুটি ভবন বৈধ অনুমোদন নিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। তাই বিদ্যমান আইনে বাকি ভবনগুলোকে বৈধ ঘোষণা করার সুযোগ নেই।

জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও আরডিএর ভাইস চেয়ারম্যান অজয় কুমার দ্বিবেদী সাংবাদিকদের জানান, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের লিখিত ব্যাখ্যা পর্যালোচনার পরই ৩৮টি ভবনকে অবৈধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

তবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। উপাচার্য জহিরউদ্দিনের দাবি, যেসব ভবন নির্মিত হয়েছে, তখন সিঙ্গনখেড়া এলাকা আরডিএর আওতাভুক্তই ছিল না। ফলে সে সময় আরডিএর অনুমোদনের প্রশ্নই ওঠে না। তার ভাষায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কোর্স ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন পেয়েছে এবং সব শর্ত পূরণের পরই সেই অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

ক্যাম্পাসে অনির্দিষ্টকালের অবস্থান
১৫ জুলাই থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের বাইরে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি, ভবন ভাঙার নির্দেশ প্রত্যাহার করতে হবে।

২০১৯ সালে এখান থেকে স্নাতক সম্পন্ন করা উসামা তাইয়্যাব বলেন, অন্য ইস্যুতে আন্দোলন করে যদি শিক্ষার্থীরা কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর পদত্যাগ আদায় করতে পারে, তাহলে একটি বিশ্ববিদ্যালয় রক্ষার আন্দোলনও সফল হওয়া সম্ভব।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের স্নাতক উসমান আলীর অভিযোগ, আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের পরিবারগুলোর ওপরও চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, পুলিশ তাদের বাড়িতে গিয়ে অভিভাবকদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। তবে আন্দোলন থেকে সরে আসার কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই।

রাজনৈতিক বিতর্ক
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাতা আজম খান উত্তর প্রদেশে বিজেপির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী এবং সমাজবাদী পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন। ফলে ভবন ভাঙার নির্দেশকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কও তীব্র হয়েছে।

সমাজবাদী পার্টির বিধায়ক জাভেদ আলী খান অভিযোগ করেন, এটি শিক্ষাবিরোধী ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশ। তার মতে, বিশ্ববিদ্যালয়টি নিশানা হওয়ার পেছনে চারটি কারণ রয়েছে, এটি আজম খানের প্রতিষ্ঠিত, ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন মুলায়ম সিং যাদব, উদ্বোধন করেছিলেন অখিলেশ যাদব এবং এটি একটি সংখ্যালঘু বিশ্ববিদ্যালয়।

অন্যদিকে বিজেপির মুখপাত্র রাকেশ ত্রিপাঠী বলেন, পুরো বিষয়টি রাজনৈতিক নয়, বরং আইনি প্রক্রিয়ার অংশ। তাঁর দাবি, সমাজবাদী পার্টি ক্ষমতায় থাকাকালে অবৈধভাবে দখল করা জমিতে বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ করা হয়েছিল। এখন সরকার কেবল আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিচ্ছে।

নারী শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী নারী। তাদের অনেকেই বলছেন, নিরাপদ পরিবেশের কারণেই তারা এই প্রতিষ্ঠান বেছে নিয়েছিলেন।

আইন বিভাগের শিক্ষার্থী ইকরা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়টি বন্ধ হয়ে গেলে অনেক মুসলিম পরিবারের মেয়েদের আর উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকবে না। কারণ, অভিভাবকদের বড় অংশ অন্য শহর বা অন্য প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে রাজি হবেন না।

তিনি আরও জানান, সরকার বিকল্প কলেজে ভর্তি করানোর জন্য কাউন্সেলিং ক্যাম্প চালু করেছে। তবে অধিকাংশ শিক্ষার্থী নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে আগ্রহী নন।

শুধু মুসলিম নয়, প্রতিবাদে হিন্দু শিক্ষার্থীরাও
বিশ্ববিদ্যালয়টির এক-তৃতীয়াংশের বেশি শিক্ষার্থী হিন্দু সম্প্রদায়ের। তাদের অনেকেও আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন।

প্যারামেডিক্যালের শিক্ষার্থী চাঁদনি দিবাকর বলেন, আইনি মর্যাদায় এটি সংখ্যালঘু বিশ্ববিদ্যালয় হলেও বাস্তবে এখানে সব ধর্মের শিক্ষার্থীরাই পড়াশোনা করেন। এক বছর ধরে ক্যাম্পাসে থেকেও তিনি কখনো নিজেকে ভিন্ন ধর্মের মানুষ হিসেবে বিচ্ছিন্ন মনে করেননি।

আদালতের লড়াইয়ের অপেক্ষা
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে আরডিএর আদেশের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই শুরু করেছে। তাদের দাবি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস করা সাংবিধানিকভাবে শিক্ষার অধিকারের পরিপন্থী।

অন্যদিকে প্রশাসনের অবস্থান, বিদ্যমান আইন অনুযায়ী কথিত অনিয়ম বৈধ করার সুযোগ নেই। তাই আইনি কাঠামোর মধ্যে ভবন অপসারণই একমাত্র পথ।

এদিকে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে ইতোমধ্যে সমাজবাদী পার্টির একাধিক নেতা সংহতি প্রকাশ করেছেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত আদালতের সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে।

এরই মধ্যে রামপুরে শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন একটাই, এই বিশ্ববিদ্যালয় টিকে থাকবে, নাকি কয়েক হাজার শিক্ষার্থীর শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *