পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) নেতা ইমরান খানকে কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে দেশটির ক্ষমতাকেন্দ্রে নীরব আলোচনা চলছে। তবে সম্ভাব্য এই মুক্তি নিঃশর্ত হবে না বলেই ইঙ্গিত মিলেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, স্বাস্থ্যগত কারণকে ভিত্তি করে তাকে মুক্তি দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় আনা হচ্ছে এবং এ নিয়ে তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতায় প্রাথমিক পর্যায়ের আলোচনা শুরু হয়েছে।
পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর ঘনিষ্ঠ একাধিক সূত্র এবং ইমরান খানের পরিবারের সদস্যরা আলোচনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
আলোচনার সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি সূত্রের ভাষ্য, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অচলাবস্থা দেশের জন্য বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই পাকিস্তানকে স্থিতিশীল পথে ফিরিয়ে আনতে সংকটের রাজনৈতিক সমাধান প্রয়োজন।
২০২৩ সালে দুর্নীতির মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারে বন্দি রয়েছেন ৭৩ বছর বয়সী ইমরান খান। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে দুর্নীতির অভিযোগে তাকে আটক করা হয়েছে, অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, পাকিস্তানের শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়াই তার কারাবন্দি হওয়ার মূল কারণ।
পাকিস্তানের আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় বিশেষ পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে বন্দিকে মুক্তি দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। সেই বিবেচনায় ইমরান খানের শারীরিক অবস্থাকে গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। চলতি বছরের শুরুতে তার চোখে অস্ত্রোপচারও করা হয়েছিল।
গত কয়েক মাস ধরে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ইমরান খানের সাক্ষাৎ বন্ধ রয়েছে। বাইরের বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় তার শারীরিক অবস্থা নিয়ে পরিবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এমনকি সম্প্রতি তার মৃত্যুর গুজবও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য অবজারভারে দেওয়া যৌথ বিবৃতিতে ইমরান খানের দুই ছেলে সুলায়মান খান ও কাসিম খান বলেন, এখন আর নীরব থাকার সুযোগ নেই। তাদের দাবি, সাত মাসেরও বেশি সময় ধরে তাদের বাবা সম্পূর্ণভাবে বাইরের জগত থেকে বিচ্ছিন্ন রয়েছেন। দীর্ঘ কারাবাসে তার স্বাস্থ্যের অবনতি হয়েছে বলে তারা আশঙ্কা করছেন। একই সঙ্গে তারা অভিযোগ করেন, পরিবারের সদস্যদের নিয়মিত ও স্বাধীনভাবে তার সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগও দেওয়া হচ্ছে না।
ইমরান খানের আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমবিষয়ক উপদেষ্টা সাইয়েদ জুলফি বুখারি দ্য অবজারভারকে বলেন, ইমরান খানের শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হচ্ছে এবং তার জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন। তিনি অভিযোগ করেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে একাকী বন্দি করে রাখা হয়েছে এবং তার বোন, পরিবারের সদস্য ও আইনজীবীদেরও দেখা করতে দেওয়া হচ্ছে না। সরকারের উচিত স্বাস্থ্যগত কারণে তাকে মুক্তি দেওয়া।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সম্ভাব্য সমঝোতার অংশ হিসেবে ইমরান খানের সামনে কয়েকটি কঠোর শর্ত রাখা হতে পারে। এর মধ্যে দেশত্যাগ, নির্দিষ্ট সময়ের জন্য রাজনীতি থেকে দূরে থাকা এবং রাজনৈতিক বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো বক্তব্য না দেওয়ার মতো শর্ত থাকতে পারে।
এ ধরনের সমঝোতার নজির পাকিস্তানের রাজনীতিতে আগেও রয়েছে। ২০১৯ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফও সামরিক বাহিনীর সঙ্গে বিরোধের প্রেক্ষাপটে দুর্নীতির মামলায় কারাবন্দি ছিলেন। পরে রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে চিকিৎসার জন্য তাকে লন্ডনে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
তবে বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, ইমরান খান শেষ পর্যন্ত এমন কোনো শর্ত মেনে নেবেন কি না। এ বিষয়ে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও মানবাধিকার আইনজীবী ক্লাইভ স্ট্যাফোর্ড স্মিথ বলেন, ইমরান স্বভাবগতভাবেই আপসহীন। ক্রিকেট ক্যারিয়ারে ওয়েস্ট ইন্ডিজের গতিময় বোলারদের বিপক্ষে খেলতেও তিনি হেলমেট পরতে রাজি হননি। তাই রাজনৈতিক মুক্তির বিনিময়ে কঠোর শর্ত মেনে নেওয়ার সম্ভাবনা কম বলেই তিনি মনে করেন। তবে ব্যক্তিগতভাবে তিনি চান, ইমরান যদি মুক্তির সুযোগ পান, তাহলে সেটি গ্রহণ করুন, কারণ তিনি কারাগারে একাকী অবস্থায় তার মৃত্যু দেখতে চান না।








