ইরানের নিরাপত্তা কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। দেশটির সর্বোচ্চ নিরাপত্তা সংস্থা সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের (এসএনএসসি) প্রধান করা হয়েছে সাবেক আইআরজিসি কমান্ডার মোহসেন রেজায়িকে। একই সঙ্গে সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা আলী খামেনির প্রতিনিধি হিসেবেও তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
রেজায়ির এই নিয়োগকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি প্রতিক্রিয়া এসেছে ইসরায়েল থেকে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দাবি, ১৯৯৪ সালে আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস এইরেসে ইহুদি কমিউনিটি সেন্টারে বোমা হামলার ঘটনায় রেজায়ি ও ইরানের নতুন আইআরজিসি প্রধান আহমাদ ভাহিদির বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। ওই হামলায় ৮৫ জন নিহত হয়েছিলেন। ইসরায়েলের ভাষ্য অনুযায়ী, দুজনের বিরুদ্ধেই ইন্টারপোলের রেড নোটিশ রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটেই ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা পদগুলোর একটিতে রেজায়ির ফিরে আসাকে তাৎপর্যপূর্ণ মনে করা হচ্ছে।
৭১ বছর বয়সী রেজায়ি দীর্ঘদিন ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। তিনি প্রায় ১৬ বছর ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) নেতৃত্ব দিয়েছেন। ১৯৮০-এর দশকে ইরাক-ইরান যুদ্ধের সময়ও তিনি বাহিনীটির কমান্ডার-ইন-চিফ ছিলেন।
এরপর সামরিক দায়িত্ব থেকে ধীরে ধীরে রাজনীতি ও অর্থনীতিতে সক্রিয় হন রেজায়ি। তিনি একসময় এক্সপেডিয়েন্সি কাউন্সিলের সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করেন। ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ইব্রাহিম রাইসির প্রেসিডেন্ট থাকার সময় অর্থনৈতিক বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের সমন্বয়ের ক্ষমতাও তার হাতে ছিল।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে চারবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেও অবশ্য কখনো নির্বাচিত হতে পারেননি তিনি।
একসঙ্গে বদলেছে ইরানের নিরাপত্তা কাঠামো
রেজায়িকে এসএনএসসির দায়িত্ব দেওয়ার পাশাপাশি ইরানের সামরিক নেতৃত্বেও বেশ কয়েকটি পরিবর্তন আনা হয়েছে।‘যৌথ যুদ্ধ কমান্ড’-এর প্রধান আলী আবদুল্লাহিকে সশস্ত্র বাহিনীর নতুন চিফ অব স্টাফ করা হয়েছে। আলী ওজমাই পেয়েছেন আইআরজিসির নৌবাহিনীর প্রধানের দায়িত্ব।
অন্যদিকে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমাদ ভাহিদিকে আইআরজিসির কমান্ডার-ইন-চিফ হিসেবে নিশ্চিত করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে তিনি মোহাম্মাদ পাকপুরের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধের প্রথম দফার হামলায় পাকপুর নিহত হন।
জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতির সহকারী অধ্যাপক সিনা আজোদি মনে করেন, এসব নিয়োগ ইরানের অবস্থান নরম হওয়ার কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছে না।
আল-জাজিরাকে তিনি বলেন, খামেনি, ভাহিদি ও আইআরজিসির নেতৃত্বের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ অব্যাহত রাখার বিষয়ে যথেষ্ট ঐকমত্য রয়েছে।
আজোদির মতে, রেজায়ির সবচেয়ে বড় শক্তি তার দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা। আইআরজিসির শীর্ষ পর্যায় থেকে সাধারণ সদস্য পর্যায়েই তার প্রভাব রয়েছে।
তার ধারণা, নতুন দায়িত্বে রেজায়ির অন্যতম লক্ষ্য হতে পারে আইআরজিসির অভ্যন্তরীণ সংহতি বাড়ানো, নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করা এবং সামরিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে অভিজ্ঞ নেতৃত্ব কাজে লাগানো।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার বিরোধিতা করেছিলেন রেজায়ি
ইরানের নতুন নিরাপত্তাপ্রধান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার পক্ষে ছিলেন না, এটিও তার নিয়োগকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
গত জুনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের একটি সমঝোতা স্মারকের বিরোধিতা করেছিলেন রেজায়ি। ওই সমঝোতার আওতায় সাময়িকভাবে ইরানের ওপর নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া এবং তেলবিষয়ক নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এর ফলে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার পথও তৈরি হয়।
রেজায়ির অবস্থান ছিল, তার মতামত মোজতবা খামেনির অবস্থানের কাছাকাছি। শেষ পর্যন্ত আপত্তি থাকা সত্ত্বেও সর্বোচ্চ নেতা ওই সমঝোতায় অনুমোদন দেন।
সমঝোতা স্থগিত হওয়ার কিছুদিন আগে রেজায়ি বলেছিলেন, যারা আলোচনার বিরোধিতা করছেন, তাদের অপেক্ষা করতে হবে। তার দাবি ছিল, মার্কিনরাই শেষ পর্যন্ত আলোচনা ভেস্তে দেবে। এরপর আবার হামলা শুরু হলে সেই সমঝোতা কার্যত স্থগিত হয়ে যায়।
গত সপ্তাহেও রেজায়ি যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে বলেন, দেশটিকে তার আচরণ পরিবর্তন করতে হবে। অন্যথায় মার্কিন সেনাদের গুরুতর ঝুঁকি ও প্রাণহানির মুখে পড়তে হতে পারে।
হরমুজ প্রণালি নিয়েও তিনি কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তার বক্তব্য, ইরান ওই জলপথে দ্বিতীয় কোনো করিডোর খোলার অনুমতি দেবে না।
কেন রেজায়ির হাতে নিরাপত্তার দায়িত্ব?
ইরানের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নুরনিউজ রেজায়ির নিয়োগকে বৃহত্তর ‘কৌশলগত পুনর্গঠনের’ অংশ হিসেবে দেখছে।
তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুদ্ধপরবর্তী নতুন বাস্তবতায় সামরিক, কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও জ্বালানি নীতির মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সমন্বয় প্রয়োজন। রেজায়ির দীর্ঘ সামরিক ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা সেই সমন্বয়ে কাজে লাগতে পারে।
এসএনএসসিতে ইরানের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সশস্ত্র বাহিনী এবং নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। এই পর্ষদ সর্বোচ্চ নেতার দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয়ের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তবে বড় কোনো সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত অনুমোদন দিতে হয় সর্বোচ্চ নেতার দপ্তরকে।
রেজায়ির আগে এই দায়িত্বে ছিলেন মোহাম্মাদ বাঘের জোলঘাদর। স্থানীয় গণমাধ্যমে আগে থেকেই তার পরিবর্তনের আলোচনা চলছিল। কিছু প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান রেজায়ির নিয়োগে আপত্তি জানিয়েছিলেন।
তবে নুরনিউজ বলেছে, জোলঘাদরকে ব্যর্থতার কারণে সরানো হয়েছে, এমন ধারণা ঠিক নয়। তাকে সরিয়ে রেজায়িকে আনার বিষয়টিকে তারা নতুন পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার পরিবর্তন হিসেবে দেখছে।
অন্যদিকে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, জোলঘাদর ছিলেন পার্লামেন্টের স্পিকার ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মাদ বাঘের গালিবাফের ঘনিষ্ঠ। ফলে তার পরিবর্তনের পেছনে গালিবাফের রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও থাকতে পারে।
তবে গালিবাফসহ ভাহিদি ও বিচার বিভাগের নতুন প্রধান গোলাম-হোসেইন মোহসেনি-এজেই রেজায়িকে নিয়োগ পাওয়ায় অভিনন্দন জানিয়েছেন।
ইসরায়েলের আপত্তির মূল কারণ
রেজায়ির অতীত সামরিক ভূমিকা এবং ইসরায়েলের অভিযোগই তার নিয়োগের পর সবচেয়ে বড় বিতর্কের জায়গা হয়ে উঠেছে।
ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রেজায়ি ও ভাহিদিকে এমন দুই ব্যক্তি হিসেবে তুলে ধরেছে, যাদের বিরুদ্ধে ১৯৯৪ সালের বুয়েনস এইরেসের ইহুদি কমিউনিটি সেন্টারে বোমা হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
ইসরায়েলের ভাষ্য, এই হামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ রয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইরানি নেতৃত্বের সমালোচনা করে বলেছে, তারা সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পুরস্কৃত করছে এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসাচ্ছে।
তবে রেজায়ি দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত। ২০১৫ সালে ইরানের পরমাণু চুক্তির আগে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য স্থল হামলার বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন।
সম্প্রতি তার নিয়োগের পর ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনেও ইরাক যুদ্ধের সময়কার রেজায়ির সামরিক কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রতিবেদন প্রচার করা হয়েছে। সেখানে তাকে দৃঢ় সামরিক চিন্তাধারার কমান্ডার হিসেবে তুলে ধরা হয়।
ইরানের কট্টরপন্থী মহলেও তার নিয়োগকে স্বাগত জানানো হয়েছে। তাদের কাছে রেজায়ি এমন একজন নেতা, যিনি সামরিক সংঘাতের ক্ষেত্রে আপস না করার অবস্থানের জন্য পরিচিত।
অতি রক্ষণশীল নেতা সাঈদ জলিলির ঘনিষ্ঠ আইনপ্রণেতা আমির হোসেইন সাবেতি দাবি করেছেন, রেজায়িকে নিয়োগের মধ্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত কট্টরপন্থী সর্বোচ্চ নেতার ইচ্ছারই জয় হয়েছে।
এদিকে যুদ্ধ শুরুর পর সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিকে প্রকাশ্যে খুব একটা দেখা যায়নি। তার শারীরিক অবস্থা নিয়েও নানা জল্পনা ছড়িয়েছে। তবে ইরানের কর্মকর্তারা এসব দাবি নাকচ করে আসছেন।
প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও জানিয়েছেন, সম্প্রতি তিনি মোজতবা খামেনির সঙ্গে সাত ঘণ্টার বৈঠক করেছেন। ওই বৈঠকে সর্বোচ্চ নেতা ‘ঐক্যের’ ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বলে জানান তিনি।
রেজায়ির নতুন দায়িত্ব শুধু একজন কর্মকর্তার পদবদল নয়। ইরানের যুদ্ধকালীন নিরাপত্তা কাঠামো, সামরিক নেতৃত্ব এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ক্ষেত্রে তেহরান কোন পথে হাঁটতে চায়, তার নিয়োগ সেই প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে। আর সেই কারণেই রেড নোটিশে থাকা এই সাবেক আইআরজিসি কমান্ডারের উত্থানকে গভীর নজরে দেখছে ইসরায়েল।








