যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তুরস্ক সফর শেষে ওয়াশিংটনে ফেরার ঘটনাটি বাইরে থেকে যতটা স্বাভাবিক মনে হয়েছিল, ভেতরের বাস্তবতা ছিল তার চেয়ে অনেক বেশি রহস্যময়। প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে সেদিন একাধিক উড়োজাহাজ, গোপন স্থানান্তর এবং সাংবাদিকদের বিভ্রান্ত রাখার কৌশল ব্যবহার করা হয়েছিল। তবে সফরে থাকা সাংবাদিকেরা প্রকৃত ঘটনা জানতে পারেন প্রায় এক মাস পর।
গত ৮ জুলাই ন্যাটো সম্মেলন শেষে তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারা ছাড়ার আগে ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, কাতারের দেওয়া নতুন এয়ারফোর্স ওয়ানে তিনি দেশে ফিরবেন না। অথচ ওই উড়োজাহাজেই তিনি আঙ্কারায় গিয়েছিলেন। তার ঘোষণায় বলা হয়েছিল, উড়োজাহাজটি আগেই যুক্তরাজ্যের মিলডেনহল বিমানঘাঁটিতে পাঠানো হয়েছে, যাতে সেখানে থাকা মার্কিন সামরিক সদস্যরা সেটি ঘুরে দেখতে পারেন।
সফরসঙ্গী সাংবাদিকদের কাছে ব্যাখ্যাটি খুব একটা বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের সাংবাদিক গ্রাম স্ল্যাটারির বর্ণনা অনুযায়ী, ঘটনাটি নিয়ে শুরু থেকেই তাদের মধ্যে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়।
জানালার পর্দা নামানোর নির্দেশ
আঙ্কারা থেকে যাত্রার সময় সাংবাদিকদের একটি উড়োজাহাজে তোলা হয়। সেখানে হোয়াইট হাউসের কর্মীরা জানালার পর্দা নামিয়ে রাখতে বলেন। কেন এমন নির্দেশ দেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে সাংবাদিকদের বলা হয়, এটি সিক্রেট সার্ভিসের নির্দেশ।
স্ল্যাটারির কাছে বিষয়টি অস্বাভাবিক মনে হয়েছিল। প্রেসিডেন্টের উড়োজাহাজে ভ্রমণের আগের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি জানতেন, সাংবাদিকদের এ ধরনের নির্দেশনা সাধারণ ঘটনা নয়।
এরই মধ্যে সফরসূচিতে অস্বাভাবিক পরিবর্তন এবং ট্রাম্পের উড়োজাহাজ বদলের ঘোষণা সাংবাদিকদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি করে। তাদের কেউ কেউ এমন প্রশ্নও তুলেছিলেন, ইরানের পক্ষ থেকে ট্রাম্পকে হত্যার কোনো সুনির্দিষ্ট হুমকি বা পরিকল্পনা রয়েছে কি না। পরে জানা যায়, তাদের সন্দেহ পুরোপুরি অমূলক ছিল না।
সাংবাদিকদের চোখের সামনেই চলছিল ‘অপারেশন’
মিলডেনহলে পৌঁছানোর পর ঘটনাটি আরও অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে। সাংবাদিকেরা যে উড়োজাহাজে ছিলেন, সেখান থেকে ট্রাম্পকে নামতে দেখেন তারা। পরে জানা যায়, সেটিও ছিল পরিকল্পনার অংশ।
হোয়াইট হাউসের কর্মীরা সাংবাদিকদের ট্রাম্পকে অনুসরণ করতে বলেন। প্রেসিডেন্ট তখন হেঁটে যাচ্ছিলেন কাতারের দেওয়া নতুন এয়ারফোর্স ওয়ানের দিকে। উড়োজাহাজটি কয়েক শ গজ দূরে দাঁড় করানো ছিল।
ট্রাম্পের দুই পাশে ছিলেন সিক্রেট সার্ভিসের সদস্যরা। পাশে ধীরে ধীরে এগোচ্ছিল একটি কালো সরকারি এসইউভি। পুরো দৃশ্যটি স্ল্যাটারির কাছে এতটাই অস্বাভাবিক লেগেছিল যে তার মনে হয়েছিল, যেন কোনো চলচ্চিত্রের দৃশ্য দেখছেন।
নতুন এয়ারফোর্স ওয়ানে ওঠার পর সাংবাদিকদের হাতে ট্রাম্পের ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া একটি পোস্টের ছাপা কপি তুলে দেওয়া হয়। সেখানে মিলডেনহল বিমানঘাঁটিতে উড়োজাহাজটির সামনে জড়ো হওয়া সামরিক সদস্য ও তাদের পরিবারের সদস্যদের ছবি ছিল।
ট্রাম্পের ভাষ্য ছিল, বিমানঘাঁটির পুরো কর্মীবাহিনী উড়োজাহাজটি দেখতে চেয়েছিল। তাঁর দাবি অনুযায়ী, মিলডেনহলে যাত্রাবিরতি দিতে আঙ্কারা থেকে ওয়াশিংটনের স্বাভাবিক রুটে প্রায় কোনো পরিবর্তনই করতে হয়নি।
প্রকৃত কারণ জানতে আরও এক মাস
এরপর ট্রাম্প সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে তাদের কেবিনে আসেন। সাংবাদিকেরা তাকে প্রশ্ন করেন, কেন কাতারের দেওয়া নতুন এয়ারফোর্স ওয়ানে করে তিনি যুক্তরাজ্যে গেলেন না। কিন্তু নিরাপত্তাজনিত কোনো উদ্বেগের কথা তখন অস্বীকার করেন ট্রাম্প।
স্ল্যাটারির বর্ণনা অনুযায়ী, ঘটনার প্রায় এক মাস পর তারা জানতে পারেন, ট্রাম্প আসলে সাংবাদিকদের সঙ্গে থাকা উড়োজাহাজে মিলডেনহল পর্যন্ত যাননি। পুরো পরিকল্পনায় তৃতীয় একটি উড়োজাহাজও ব্যবহার করা হয়েছিল।
নিরাপত্তাজনিত কারণে গোপন এই স্থানান্তরের অংশ হিসেবে ট্রাম্পকে ক্যাটারিং ট্রাকের মাধ্যমে একটি উড়োজাহাজ থেকে নামিয়ে অন্য একটি সামরিক উড়োজাহাজে নেওয়া হয়েছিল। সাংবাদিকদের জানালার পর্দা নামিয়ে রাখার নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল যাতে এই তৎপরতা তাদের চোখে না পড়ে।
অর্থাৎ, সাংবাদিকেরা যে ঘটনাকে একটি সাধারণ উড়োজাহাজ পরিবর্তন হিসেবে দেখেছিলেন, সেটি আসলে ছিল প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নেওয়া একটি পরিকল্পিত গোপন ব্যবস্থা।
ইরানের হুমকির প্রসঙ্গ তুললেন ট্রাম্প
ঘটনার সময় ট্রাম্প নিজেও বারবার ইরানের পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে কথিত হুমকির প্রসঙ্গ তুলছিলেন। ন্যাটো সম্মেলনের শেষ দিনে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠকের সময়ও তিনি এ বিষয়ে সাংবাদিকদের মন্তব্য করেন।
পরে সাংবাদিকেরা যখন তাকে জানালার পর্দা নামানোর কারণ সম্পর্কে প্রশ্ন করেন, তখন ট্রাম্প ইরানের হুমকির প্রসঙ্গ স্বীকার করেন।
স্ল্যাটারির বর্ণনা অনুযায়ী, তখন ট্রাম্প সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, “কিন্তু যদি আমি (মারা) যাই, আপনারাও যাবেন। তাই তো? হয়তো কোনো এক দিন আপনারাও পেশা বদলাতে চাইবেন।”
কেন এত গোপনীয়তা?
স্ল্যাটারির মতে, সেদিনের ঘটনাপ্রবাহ এখন পেছন ফিরে দেখলে অনেক বেশি পরিষ্কার। সফরসূচির আকস্মিক পরিবর্তন, নতুন এয়ারফোর্স ওয়ান ব্যবহার না করার ঘোষণা, সাংবাদিকদের জানালার পর্দা নামিয়ে রাখা, ট্রাম্পের অনুপস্থিতি এবং পরে মিলডেনহলে তার হঠাৎ উপস্থিতি ছিল একই নিরাপত্তা পরিকল্পনার অংশ।
এয়ারফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের তথ্য পাওয়ার সুযোগও সীমিত থাকে। নিরাপত্তার কারণে তাদের ওয়াই-ফাই ব্যবহারের সুযোগ থাকে না এবং হোয়াইট হাউসের কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগও সাধারণত সীমিত।
ফলে আঙ্কারা থেকে মিলডেনহল পর্যন্ত যাত্রায় সাংবাদিকেরা প্রকৃত পরিস্থিতি বুঝতে পারেননি। তাদের ধারণা ছিল, ট্রাম্প যেকোনো সময় তাদের সামনে হাজির হতে পারেন। পরে জানা যায়, প্রেসিডেন্ট তাদের সঙ্গে ছিলেন না।
স্ল্যাটারির ভাষ্য অনুযায়ী, তখন ট্রাম্প কেন সাংবাদিকদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলাপে যোগ দেননি, সেটিও পরিষ্কার হয়ে যায়। সাধারণ সময়ে তিনি এয়ারফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা না বললেও সেদিনের অনুপস্থিতির পেছনে ছিল আরও গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
তুরস্ক থেকে ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তন ছিল শুধু একটি উড়োজাহাজ বদলের ঘটনা নয়। প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে সাংবাদিকদের সামনেই পরিচালিত হয়েছিল একটি সুচিন্তিত গোপন অভিযান, যার আসল চিত্র তারা জানতে পারেন কয়েক সপ্তাহ পর।








