সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬

সবশেষ

ভূমধ্যসাগরে নৌকায় ১০ দিন ভেসে ১০ জনের মৃত্যু, জীবিত উদ্ধার ২৯ বাংলাদেশি অভিবাসনপ্রত্যাশী!

গ্রিসে পৌঁছানোর আশায় লিবিয়া থেকে রওনা দিয়েছিলেন ৪২ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী। যাত্রার সময় তাদের বলা হয়েছিল, ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে লাগবে মাত্র ৩৬ ঘণ্টা। কিন্তু নেভিগেশনব্যবস্থাহীন একটি রাবারের নৌকায় সেই যাত্রা পরিণত হয় ভয়াবহ মৃত্যুফাঁদে।

জ্বালানি শেষ হয়ে যাওয়ার পর দিক হারিয়ে প্রায় ১০ দিন ভূমধ্যসাগরে ভাসতে থাকে নৌকাটি। তীব্র গরম, প্রচণ্ড রোদ, খাবার ও পানির সংকটে শেষ পর্যন্ত মারা যান ৯ বাংলাদেশি ও ১ সুদানি নাগরিক। জীবিত ২৯ বাংলাদেশিকে পরে মিসরের মারসা মাতরুহ উপকূল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। বর্তমানে তারা স্থানীয় একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

রোববার এ তথ্য জানিয়েছে মিসরের কায়রোতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস।

৩ আগস্ট লিবিয়া থেকে যাত্রা
দূতাবাসের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, গত ৩ আগস্ট লিবিয়ার তবরুক থেকে গ্রিসের উদ্দেশে রাবারের একটি নৌকায় যাত্রা করেন ৩৮ বাংলাদেশি ও ৪ সুদানি নাগরিক। নৌকাটি একটি স্পিডবোট ইঞ্জিনের সাহায্যে চলছিল। তবে এতে কোনো নেভিগেশন ব্যবস্থা ছিল না।

মানব পাচার চক্রের সহায়তায় যাত্রা করা এসব অভিবাসনপ্রত্যাশীকে বলা হয়েছিল, সাগর পাড়ি দিয়ে গ্রিসে পৌঁছাতে আনুমানিক ৩৬ ঘণ্টা সময় লাগবে।

কিন্তু কিছুদূর যাওয়ার পর নৌকার জ্বালানি শেষ হয়ে যায়। এরপর নৌকাটি দিক হারিয়ে সাগরে ভাসতে থাকে। একপর্যায়ে ১০ দিন ধরে ভূমধ্যসাগরে ভেসে থাকার পর ১৩ আগস্ট সেটি মিসরের মারসা মাতরুহ এলাকার উপকূলের কাছে পৌঁছায়।

খাবার-পানির সংকটে একের পর এক মৃত্যু
দূতাবাসের সঙ্গে কথা বলা চিকিৎসাধীন বাংলাদেশি আবদুল করিমের বর্ণনা অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় সাগরে আটকে থাকার ফলে যাত্রীদের ওপর নেমে আসে চরম দুর্ভোগ।

প্রচণ্ড গরম ও সূর্যের তাপের পাশাপাশি খাবার ও পানির সংকট তৈরি হয়। এতে ৯ বাংলাদেশি ও ১ সুদানি নাগরিক অসুস্থ হয়ে মারা যান।

পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে যখন মৃতদেহগুলোতে পচন ধরতে শুরু করে। জীবিত যাত্রীরা শেষ পর্যন্ত মৃতদেহগুলো সমুদ্রে ভাসিয়ে দিতে বাধ্য হন বলে জানিয়েছেন আবদুল করিম।

উপকূলে পৌঁছানোর পর উদ্ধার
১৩ আগস্ট মিসরের মারসা মাতরুহ উপকূলে নৌকাটি পৌঁছানোর পর স্থানীয় পুলিশ ২৯ বাংলাদেশিকে উদ্ধার করে। তাদের মধ্যে ১৮ জন গুরুতর অসুস্থ ও অচেতন অবস্থায় ছিলেন।

পরে সবাইকে চিকিৎসার জন্য মারসা মাতরুহ জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

ঘটনার খবর পাওয়ার পর কায়রোর বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রথম সচিব (শ্রম) মো. জাকির হোসেন স্থানীয় পুলিশ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পুলিশের কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন, ২৯ বাংলাদেশি তাদের তত্ত্বাবধানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

পরে হাসপাতালের এক কর্মীর সহায়তায় চিকিৎসাধীন আবদুল করিমের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলেন জাকির হোসেন। তার কাছ থেকেই নৌযাত্রা ও সাগরে আটকে থাকার বিস্তারিত তথ্য পায় দূতাবাস।

চিকিৎসা ও দেশে ফেরানোর উদ্যোগ
বাংলাদেশ দূতাবাস জানিয়েছে, ঘটনার পর থেকে স্থানীয় পুলিশ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বাংলাদেশিদের শারীরিক অবস্থারও সার্বক্ষণিক খোঁজ নেওয়া হচ্ছে।

তাদের প্রয়োজনীয় কনস্যুলার ও অন্যান্য সহযোগিতা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে উঠলে মিসরের প্রচলিত আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তাদের দ্রুত বাংলাদেশে ফেরানোর ব্যবস্থা করা হবে।

গ্রিসে যাওয়ার আশায় শুরু হওয়া এই যাত্রায় ৪২ জনের মধ্যে মাত্র ২৯ জন জীবিত অবস্থায় উপকূলে পৌঁছাতে পেরেছেন। আর সাগরে হারিয়ে গেছেন ১০ জনের প্রাণ। বাকিদের পরিণতি ও এ ঘটনায় মানব পাচার চক্রের ভূমিকা নিয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *