দেশের উপজেলা পর্যায়ের সরকারি স্বাস্থ্যসেবাকে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তার ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী তিন বছরের মধ্যে দেশের সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে নয়তলা আধুনিক ভবনে রূপান্তর করা হবে। পাশাপাশি ধাপে ধাপে ৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে ১৫১ শয্যায় উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
রোববার (১৬ আগস্ট) ঝিনাইদহের মহেশপুর ও কোটচাঁদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স আকস্মিক পরিদর্শনে গিয়ে এসব পরিকল্পনার কথা জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। পরে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন তিনি।
সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, গত ১৭ বছরে দেশের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা খাত যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। তার অভিযোগ, এ সময় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় দুর্নীতি, অনিয়ম ও জবাবদিহির ঘাটতি তৈরি হয়েছিল। এর প্রভাব পড়েছে হাসপাতালের সেবা ও সাধারণ মানুষের চিকিৎসা পাওয়ার ক্ষেত্রে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, সরকারি হাসপাতালে ওষুধ কেনাকাটাতেও অনিয়ম হয়েছে। সাধারণ মানুষের জন্য বরাদ্দ করা ওষুধ, অ্যান্টি-র্যাবিস ভ্যাকসিন, অ্যান্টি-স্নেক ভেনমসহ বিভিন্ন জরুরি ইনজেকশন হাসপাতালের বাইরে বিক্রি করার ঘটনা ঘটেছে বলে তিনি জানান। অনেক রোগী প্রয়োজনীয় ওষুধ পাননি বলেও দাবি করেন তিনি।
হাসপাতালে চিকিৎসক ও নার্সদের আচরণ নিয়েও অভিযোগ পাওয়ার কথা জানান মন্ত্রী। তার ভাষ্য, কিছু হাসপাতালে চিকিৎসকদের নিয়মিত উপস্থিতি নিয়েও সমস্যা ছিল এবং রোগীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগ এসেছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে এসব বিষয়ে অভিযোগসংক্রান্ত নোট পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি।
এসব সমস্যা কাটিয়ে সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় নতুন শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। চিকিৎসকের ঘাটতি, ওষুধের সংকট এবং রোগীদের জন্য চিকিৎসাসেবা সহজ করার বিষয়গুলোকে পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, সরকারি হাসপাতালের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনাই এখন অন্যতম লক্ষ্য। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করার ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অবকাঠামো ও চিকিৎসাসেবায় পরিবর্তনের অংশ হিসেবে ১৫১ শয্যার হাসপাতালগুলোতে নতুন কিছু বিশেষায়িত সেবাও যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। মন্ত্রী জানান, এসব হাসপাতালে প্রসূতি নারীদের জন্য ২৫ শয্যার পৃথক ওয়ার্ড এবং শিশুদের জন্য ২০ শয্যার আলাদা ওয়ার্ড রাখা হবে।
এ ছাড়া উপজেলা পর্যায়েই কিডনি ডায়ালাইসিসের মতো গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাসেবা চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। তার মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শুধু হাসপাতালের অবকাঠামো নয়, দেশের চিকিৎসা দেওয়ার পদ্ধতিতেও বড় পরিবর্তন আসবে।
এর আগে সকালে মহেশপুর ও কোটচাঁদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বিভিন্ন ওয়ার্ড পরিদর্শন করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের সঙ্গে কথা বলে তাদের চিকিৎসাসেবা, হাসপাতালের খাবার এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনার খোঁজ নেন তিনি। পরে কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সও পরিদর্শন করেন।
এ সময় স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তা এবং সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, উপজেলা পর্যায়ে বড় হাসপাতাল, বাড়তি শয্যা, পৃথক মাতৃ ও শিশু ওয়ার্ড এবং ডায়ালাইসিসের মতো সেবা চালুর পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হচ্ছে চিকিৎসার জন্য সাধারণ মানুষের জেলা বা বড় শহরমুখী নির্ভরতা কমানো। পাশাপাশি দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও সেবার ঘাটতি কাটিয়ে সরকারি চিকিৎসাব্যবস্থায় মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতেও জোর দেওয়া হচ্ছে।








