মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬

সবশেষ

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কমায় তেলের বাজারে ফের অস্থিরতা, ৯১ ডলার ছাড়াল ব্রেন্ট

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যুদ্ধবিরতি আর না বাড়ায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। এশিয়ার বাজারে মঙ্গলবার সকালে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯১ দশমিক ০৬ ডলারে পৌঁছেছে, যা প্রায় ছয় সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ। আগের দিনও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ২ ডলারের বেশি বেড়েছিল।

চলতি সপ্তাহের প্রথম দুই দিনে টানা মূল্যবৃদ্ধির ফলে ব্রেন্টের দাম আবারও ৯০ ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে সরবরাহে বড় ধরনের ব্যাঘাতের আশঙ্কাই মূলত তেলের বাজারকে চাপে ফেলছে।

নজর এখন হরমুজ প্রণালিতে
তেলের বাজারে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথগুলোর একটি এই জলপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল পরিবহন করা হয়। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় অগ্রগতি না হওয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে এই পথে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

তথ্য অনুযায়ী, গত শনিবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে মাত্র পাঁচটি তেলবাহী জাহাজ চলাচল করেছে। পরদিন রোববার কোনো তেলবাহী ট্যাংকারই এই পথে যায়নি। অথচ তার আগের রোববার ৩১টি ট্যাংকার চলাচল করেছিল। এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে তেলের দাম দ্রুত আরও বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

এর সঙ্গে লোহিত সাগরে হুতিদের হামলার ঘটনাও সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ঘিরে ঝুঁকি বাড়ায় বিশ্ববাজারে তেলের ভবিষ্যৎ সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরও তীব্র হয়েছে।

যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আর বাড়ছে না
২০২৬ সালের ৮ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রথম দফায় দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল। পরে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়। ১৭ জুন ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়। পরবর্তী সময়ে এই সময়সীমা বাড়ানোর বিষয়ে সাময়িক সম্মতিও হয়েছিল দুই পক্ষের।

তবে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আর বাড়ানো হচ্ছে না। ফলে ইরান জানিয়েছে, তারা ‘পূর্ণ আক্রমণাত্মক’ সামরিক অবস্থানে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়াতে সম্মত হয়নি। এ অবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যার তাৎক্ষণিক প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে তেলের বাজারে।

মূল্যস্ফীতির নতুন চাপের আশঙ্কা
তেলের দাম বাড়ার প্রভাব শুধু জ্বালানি বাজারেই সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা নেই। এর প্রভাব পড়তে পারে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতিতেও। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় তেলের দাম বেশি থাকলে পণ্য পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়ার মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের বন্ড বাজারেও এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে। দেশটির ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদহার বেড়ে ৪ দশমিক ৭২৮ শতাংশে উঠেছে। ৩০ বছর মেয়াদি বন্ডের সুদহারও প্রায় দুই দশকের সর্বোচ্চ ৫ দশমিক ৩১৫ শতাংশে পৌঁছেছে।

তেলের দাম বাড়ার কারণে মূল্যস্ফীতির চাপ আবার বাড়ার আশঙ্কা থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভকে দীর্ঘ সময় তুলনামূলক উচ্চ সুদের হার ধরে রাখতে হতে পারে বলে বাজারে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

দুর্বল অর্থনীতির মধ্যে নতুন ঝুঁকি
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে ইতোমধ্যে কিছু দুর্বলতার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। জুলাইয়ে দেশটির খুচরা বিক্রি কমেছে। পাশাপাশি শ্রমবাজারের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানও বাজারের প্রত্যাশার তুলনায় দুর্বল হয়েছে।

এর ফলে ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে বাজারের আগের প্রত্যাশা কিছুটা কমেছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়ে তেলের দাম আরও বাড়লে মূল্যস্ফীতি আবার ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে। তখন সুদের হার বাড়ানোর চাপও নতুন করে তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

১০০ ডলারের দিকে ফেরার শঙ্কা
বর্তমানে বৈশ্বিক তেলবাজারের নজর মূলত হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের পরিস্থিতি এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ। যুদ্ধবিরতি পুনর্বহাল না হলে এবং হরমুজ প্রণালিতে জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হলে সরবরাহঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম আবারও ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।

চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর আগে ব্রেন্টের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭২ ডলার। সংঘাতের প্রভাবে ৩০ এপ্রিল তা বেড়ে ১২৬ ডলারে পৌঁছায়। পরে ২৬ জুন আবার ৭২ ডলারে নেমে আসে। এরপর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি ও সরবরাহঝুঁকির ওপর নির্ভর করে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ওঠানামা করছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *