বিদেশে যাওয়ার আগে শুধু একটি কারিগরি প্রশিক্ষণ নিলেই কাঙ্ক্ষিত চাকরি নিশ্চিত হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। কোনো দেশে কোনো পেশার কর্মীর চাহিদা বেশি, সেটি জেনে সেই অনুযায়ী দক্ষতা অর্জন করাই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে প্রশিক্ষিত কর্মী তৈরি করতে পারলে বিদেশে বাংলাদেশি শ্রমিকদের ভালো কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে।
সরকারি হিসাবে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বর্তমানে প্রায় এক কোটি ৩৯ লাখ বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিক হিসেবে কর্মরত। এর মধ্যে শুধু ২০২৫ সালেই কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে বিদেশে গেছেন প্রায় ১১ লাখ ২৮ হাজার বাংলাদেশি। তবে তাদের ৭৭ শতাংশই কম দক্ষ শ্রেণির কর্মী।
দক্ষ কর্মীর ঘাটতির বিষয়টি স্বীকার করে প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী সম্প্রতি বলেছেন, বিদেশি নিয়োগকর্তাদের চাহিদা অনুযায়ী সব সময় বাংলাদেশ থেকে প্রয়োজনীয় দক্ষতার কর্মী পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না।
এই পরিস্থিতি পরিবর্তনে নতুন একটি উদ্যোগের কথাও জানিয়েছেন তিনি। কোনো দেশ নির্দিষ্ট ধরনের দক্ষ কর্মী চাইলে সেই দেশের নিয়োগকর্তা বা প্রশিক্ষকরা বাংলাদেশে এসে কর্মীদের দক্ষতা ও প্রশিক্ষণ যাচাই করবেন। তাদের মূল্যায়নে সন্তুষ্ট হওয়ার পরই কর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে।
মধ্যপ্রাচ্যে ওয়েল্ডিং ও কারিগরি কাজে চাহিদা
বাংলাদেশের প্রধান শ্রমবাজার এখনও মধ্যপ্রাচ্য। এ অঞ্চলের শিল্প, নির্মাণ ও যান্ত্রিক খাতে দক্ষ কর্মীর চাহিদা তুলনামূলক বেশি বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) সাবেক মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী।
তিনি জানান, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বড় পরিসরে উন্নয়ন ও নির্মাণকাজ চলছে। এর ফলে দক্ষ নির্মাণ শ্রমিক ও কারিগরি কর্মীর প্রয়োজন তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে মেকানিক্যাল ওয়েল্ডিংয়ে দক্ষ কর্মীদের চাহিদা বাড়ছে।
তাই মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলে নির্মাণকাজ, ওয়েল্ডিং, মেকানিক্যাল ও শিল্পভিত্তিক বিভিন্ন কাজে প্রশিক্ষণ নেওয়া কর্মীদের জন্য তুলনামূলক ভালো সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ইউরোপে কেয়ারগিভিং, কৃষিকাজে সুযোগ
ইউরোপের শ্রমবাজারে কেয়ারগিভার এবং কৃষিখাতের প্রাথমিক কাজ জানা কর্মীদের চাহিদা বাড়ছে বলে মনে করেন আলী হায়দার চৌধুরী।
তার মতে, বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর সাধারণভাবে যেকোনো একটি কারিগরি প্রশিক্ষণ নেওয়া যথেষ্ট নয়। বরং যে দেশে যে পেশায় যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, সেই চাকরির প্রয়োজনীয় দক্ষতা আগে চিহ্নিত করে প্রশিক্ষণ নেওয়া উচিত।
ইউরোপের ক্ষেত্রে কেয়ারগিভিংয়ের পাশাপাশি কৃষিখাতের বিভিন্ন প্রাথমিক কাজের প্রশিক্ষণ কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে পারে।
জাপান-কোরিয়ায় ভাষাও গুরুত্বপূর্ণ
জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় যেতে আগ্রহীদের জন্য কারিগরি দক্ষতার পাশাপাশি ভাষা শেখার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
আলী হায়দার চৌধুরী বলেন, এসব দেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে ভাষাগত দক্ষতার গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষ করে দক্ষিণ কোরিয়ার জাহাজ নির্মাণ শিল্পে ওয়েল্ডিংয়ে দক্ষ কর্মীর চাহিদা রয়েছে।
তার মতে, এসব নির্দিষ্ট কাজের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব হলে বাংলাদেশি কর্মীদের বিদেশে যাওয়ার সুযোগ আরও বাড়বে। একই সঙ্গে নতুন নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে কর্মীদের প্রশিক্ষিত করাও জরুরি।
দেশ বুঝে প্রশিক্ষণ, বাড়বে দক্ষ কর্মীর সংখ্যা
সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদেশে কাজের জন্য প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো গন্তব্য দেশ ও পেশা নির্ধারণ। একই প্রশিক্ষণ সব দেশের শ্রমবাজারে সমানভাবে কার্যকর হবে না।
মধ্যপ্রাচ্যের জন্য নির্মাণ, ওয়েল্ডিং, মেকানিক্যাল ও শিল্পভিত্তিক দক্ষতা; ইউরোপের জন্য কেয়ারগিভিং ও কৃষিকাজ; আর জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য কারিগরি দক্ষতার পাশাপাশি ভাষা শেখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
বিদেশি শ্রমবাজারের চাহিদা আগে বিশ্লেষণ করে সে অনুযায়ী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা গেলে কম দক্ষ কর্মীর পরিবর্তে বেশি সংখ্যক প্রশিক্ষিত ও দক্ষ কর্মী বিদেশে পাঠানো সম্ভব হবে। এতে শুধু বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগই বাড়বে না, আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানও শক্তিশালী হবে।








