ইস্কাটনের সেই ফ্ল্যাট, ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর। এক চিত্রনায়কের আকস্মিক মৃত্যু। এরপর অপমৃত্যুর মামলা থেকে হত্যা মামলা, একের পর এক তদন্ত, আদালতের নির্দেশ, পরিবারের নারাজি এবং দীর্ঘ আইনি লড়াই। তিন দশকে তিনটি তদন্ত সংস্থা মৃত্যুটিকে আত্মহত্যা বলেছে। তবু থামেনি প্রশ্ন। বরং সময়ের সঙ্গে প্রশ্নগুলোই নতুন করে আদালতের দরজায় ফিরেছে।
এখন সেই পুরনো প্রশ্নের সামনে নতুন করে দাঁড়িয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
চিত্রনায়ক চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন ওরফে সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় গত বছরের অক্টোবরে সাবেক স্ত্রী সামীরা হকসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা হয়েছে। মামলার তদন্তভার পেয়েছে সিআইডি। এরই মধ্যে একজন আসামি গ্রেপ্তার হয়েছেন। তার পাঁচ দিনের রিমান্ডও মঞ্জুর হয়েছে। কিন্তু রিমান্ডের আদেশ পাওয়ার পরও তাকে এখনো জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি বলে জানিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা।
এদিকে নির্ধারিত সময়ে তদন্ত প্রতিবেদনও আদালতে জমা দিতে পারেনি সিআইডি। নতুন করে সময় পাওয়া গেছে ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। তাহলে তিন দশক পর এই তদন্তে নতুন কী মিলবে?
এই প্রশ্নের উত্তরই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তিন তদন্ত, একই সিদ্ধান্ত, তবু কেন থামেনি মামলা
সালমান শাহর মৃত্যুর পর প্রথমে রমনা থানায় অপমৃত্যুর মামলা করেছিলেন তার বাবা প্রয়াত কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী। কিন্তু শুরু থেকেই মৃত্যুর ঘটনাকে স্বাভাবিক আত্মহত্যা হিসেবে মেনে নিতে পারেনি পরিবার।
১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই ছেলের মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড দাবি করে অপমৃত্যুর মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরের আবেদন করেন সালমানের বাবা। আদালতের নির্দেশে সিআইডি একই সঙ্গে অপমৃত্যু ও হত্যার অভিযোগ তদন্ত করে।
সে তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলা হয়। ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর প্রতিবেদন জমা পড়ে এবং ২৫ নভেম্বর আদালত তা গ্রহণ করেন। কিন্তু সেখানেই শেষ হয়নি বিষয়টি।
সালমানের বাবা সিআইডির প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে রিভিশন মামলা করেন। ২০০৩ সালে মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠানোর আদেশ দেয় আদালত। প্রায় ১১ বছর পর, ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট সেই তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়ে। সেখানেও হত্যার অভিযোগ নাকচ করা হয়। এরপরও পরিবারের আপত্তি থেকে যায়।
২০১৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি সালমানের মা নীলা চৌধুরী ওই প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি দেন। তার দাবি ছিল, ছেলের মৃত্যুর সঙ্গে ১১ জন জড়িত থাকতে পারেন।
পরবর্তী সময়ে তদন্তের দায়িত্ব যায় র্যাবের কাছে। কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষের আপত্তির পর ২০১৬ সালের ২১ আগস্ট র্যাবকে তদন্ত থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেয় আদালত। এরপর দায়িত্ব পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
চার বছর তদন্তের পর ২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিবিআইও আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। তাদের ভাষ্য ছিল, সালমান শাহকে হত্যার অভিযোগের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ প্রায় দুই যুগের ব্যবধানে তিন দফা তদন্তে উঠে আসে একই সিদ্ধান্ত, মৃত্যুটি আত্মহত্যা। কিন্তু পরিবারের অবস্থান বদলায়নি।
যে প্রশ্নটি আবার আদালতে ফিরিয়ে আনল মামলা
পিবিআইয়ের প্রতিবেদন ২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর আমলে নিয়ে আসামিদের অব্যাহতি দেন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মামুনুর রশীদ। এরপরও লড়াই চালিয়ে যায় সালমান শাহর পরিবার।
দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর গত বছরের ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক বাদীপক্ষের রিভিশন মঞ্জুর করেন। মামলাটি হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়।
পরদিন, ২১ অক্টোবর, রমনা থানায় হত্যা মামলা করেন সালমান শাহর মামা মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম।
মামলায় সালমানের সাবেক স্ত্রী সামীরা হকসহ ১১ জনের নাম রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। পাশাপাশি অজ্ঞাতপরিচয় আরও অনেককে আসামি করা হয়েছে। এখানেই তিন দশকের পুরোনো ঘটনাটি নতুন তদন্তের পর্বে ঢোকে।
এবার তদন্তের সামনে শুধু আসামি নয়, পুরোনো তদন্তও
নতুন মামলার তদন্তভার এখন সিআইডির হাতে। গত মে মাসে তদন্ত সংস্থার আবেদনের পর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে সালমান শাহর মরদেহ কবর থেকে উত্তোলনের অনুমতি দেয় আদালত। এ কাজের জন্য সিলেটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পিংকি সাহাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
তবে বাদীপক্ষ এই আদেশ বাতিলের আবেদন করেছে। সেটি বর্তমানে আদালতে নথিভুক্ত রয়েছে। মরদেহ উত্তোলনের বিষয়টি তাই এখনো আদালতের প্রক্রিয়ার মধ্যেই আছে।
এরই মধ্যে নতুন মামলায় প্রথম গ্রেপ্তার হয়েছেন খলনায়ক আশরাফুল হক ডন। গত ৯ আগস্ট হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে ইমিগ্রেশন পুলিশ। পরে তাকে সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়।
২০ আগস্ট তার সাত দিনের রিমান্ড চাওয়া হলে ২৭ আগস্ট আদালত পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক মজিবুর রহমান জানিয়েছেন, রিমান্ড মঞ্জুর হলেও ডনকে এখনো জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। এখানে তদন্তের গতি নিয়েও স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে।
৩০ আগস্ট তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা থাকলেও সিআইডি তা পারেনি। আদালত নতুন সময় নির্ধারণ করেছেন ২৯ সেপ্টেম্বর।
পরিবারের প্রশ্ন: গ্রেপ্তার হচ্ছে না কেন?
লন্ডন থেকে সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী বলেছেন, তিনি এবার তদন্ত শেষ হয়ে ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা করছেন।
তবে বাকি আসামিদের গ্রেপ্তার না হওয়া নিয়ে তার প্রশ্নও রয়েছে।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, আসামিরা দেশে রয়েছেন এবং তাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞাও রয়েছে। তাহলে তাদের গ্রেপ্তারে বিলম্ব কেন, এই প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
তার প্রত্যাশা, আসামিদের গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে মৃত্যুর রহস্যের অনেকটাই বেরিয়ে আসতে পারে।
তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে কাউকে গ্রেপ্তার বা রিমান্ডে নেওয়া মানেই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া নয়। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের জন্য তদন্তে পাওয়া তথ্য-প্রমাণই শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মামার দাবি, মূল প্রশ্ন সামীরাকে ঘিরে
মামলার বাদী সালমান শাহর মামা মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুমের বক্তব্য আরও নির্দিষ্ট।
তার দাবি, মৃত্যুর সময় বাসায় সামীরা, ডলি, মনোয়ার ও কাজের লোক আবুল ছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সামীরাকে পুলিশ না পেলে তার শেষ স্বামীকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেও তার অবস্থান সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
আলমগীর কুমকুম আরও বলেন, আশরাফুল হক ডন তাদের মূল আসামি ছিলেন না; রিজভী নামের এক আসামির জবানবন্দিতে তার নাম এসেছে। পরিবারের মূল অভিযোগ সামীরা হক ও তার মা-বাবাকে ঘিরে দাবিও করেছেন তিনি।
তবে এসবই বাদীপক্ষের বক্তব্য ও অভিযোগ। আদালতে অভিযোগের সত্যতা এখনো প্রমাণিত হয়নি।
৬ সেপ্টেম্বরের সেই সকাল: পরিবারের বর্ণনায় কী ঘটেছিল?
নতুন হত্যা মামলার অভিযোগে ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে একটি ভিন্ন বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।
মামলার বাদীর ভাষ্য অনুযায়ী, ওইদিন সালমানের মা নীলা চৌধুরী, বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী ও ছোট ছেলে শাহরান শাহ নিউ ইস্কাটনের বাসায় সালমানের সঙ্গে দেখা করতে যান। সেখানে গিয়ে তারা জানতে পারেন, সালমান ঘুমাচ্ছেন। কিছুক্ষণ পর প্রডাকশন ম্যানেজার সেলিম ফোন করে জানান, সালমানের কিছু হয়েছে।
পরিবারের সদস্যরা দ্রুত বাসায় ফিরে সালমানকে শয়নকক্ষে নিথর অবস্থায় দেখতে পান। অভিযোগে বলা হয়েছে, কয়েকজন বহিরাগত নারী তখন তার হাত-পায়ে তেল মালিশ করছিলেন। পাশের কক্ষে সামীরার আত্মীয় রুবি ছিলেন বলেও মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, সালমানকে হাসপাতালে নেওয়ার সময় তার গলায় দড়ির দাগ এবং মুখ ও পায়ে নীলচে দাগ দেখতে পান তারা। পরে হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল হয়ে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এই বর্ণনার সঙ্গে আগের তদন্তগুলোর সিদ্ধান্তের সম্পর্ক কী, নতুন তদন্তে সেটিই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি।
এবার কি পুরোনো প্রশ্নগুলোর নতুন উত্তর মিলবে?
সালমান শাহর মৃত্যুকে ঘিরে তিনটি পৃথক তদন্তে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত এসেছে। অন্যদিকে পরিবারের অভিযোগ, এটি হত্যাকাণ্ড। আদালতের দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পর সেই অভিযোগই আবার আনুষ্ঠানিক হত্যা মামলার রূপ পেয়েছে।
ফলে নতুন সিআইডি তদন্তের গুরুত্ব শুধু নতুন করে একজন বা একাধিক আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
তদন্তকে একই সঙ্গে ব্যাখ্যা করতে হবে, আগের তিন তদন্তে যে সিদ্ধান্ত এসেছিল, তার সঙ্গে বর্তমান মামলার অভিযোগের বিরোধ কোথায়; নতুন কোনো তথ্য বা প্রমাণ সামনে এসেছে কি না; এত বছর পর পাওয়া তথ্য কতটা নির্ভরযোগ্য; এবং মৃত্যুর সময়কার ঘটনাপ্রবাহের কোন অংশ এখনো অস্পষ্ট। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া তিন দশকের পুরোনো রহস্যের জট খোলা কঠিন।
তদন্ত কর্মকর্তা মজিবুর রহমান জানিয়েছেন, তদন্ত চলছে এবং বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তদন্তের স্বার্থে এর বাইরে তিনি বিস্তারিত বলতে রাজি হননি।
বাদীপক্ষের আইনজীবী ফারুক আহমেদ দ্রুত তদন্ত শেষ করে আসামিদের সাজা নিশ্চিত করার প্রত্যাশা জানিয়েছেন। অন্যদিকে কারাগারে থাকা আশরাফুল হক ডনের আইনজীবী এম ফরিদুল ইসলাম এ বিষয়ে মন্তব্য করতে চাননি।
তিন দশক পর এখন আসল পরীক্ষা
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর যে মৃত্যু প্রথমে একটি অপমৃত্যুর মামলা হিসেবে শুরু হয়েছিল, সেটিই তিন দশকের আইনি লড়াই পেরিয়ে এখন হত্যা মামলায় এসে দাঁড়িয়েছে।
মাঝে সিআইডি, বিচার বিভাগীয় তদন্ত এবং পিবিআই, তিনটি তদন্ত। তিনবারই আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত। তারপরও পরিবারের অভিযোগ অটুট।
এখন নতুন মামলার তদন্তে একজন আসামি গ্রেপ্তার হয়েছেন, রিমান্ডও মঞ্জুর হয়েছে; অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। আদালতও তদন্তের অগ্রগতির জন্য নতুন সময় দিয়েছেন।
তবে এই তদন্তের সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে একটি জায়গায় তিন দশক ধরে পরস্পরবিরোধী যে দুই বয়ান দাঁড়িয়ে আছে, প্রমাণের ভিত্তিতে তার কোনটি সত্য, সেটি কি এবার নির্ধারণ করা সম্ভব হবে?
সালমান শাহর পরিবার সেই উত্তর অপেক্ষায় আছে। আর তিন দশক পর তদন্তের সামনে এখন শুধু একটি মৃত্যুর রহস্য নয়, আগের তদন্তগুলোর সিদ্ধান্তকেও নতুন করে যাচাই করার প্রশ্ন।
এই কাঠামোতে ইচ্ছাকৃতভাবে “হত্যা হয়েছে” বা “আত্মহত্যা করেছেন”, কোনোটিকেই প্রতিবেদকের নিজস্ব সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি। অভিযোগ, আগের তদন্তের সিদ্ধান্ত এবং বর্তমান তদন্ত, তিনটিকে আলাদা স্তরে রাখা হয়েছে। ফলে রিপোর্টটি অনুসন্ধানী আবহ পায়, কিন্তু বিচারাধীন বিষয়কে রায় হিসেবে উপস্থাপন করে না।








