লেবাননে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় নিহত সাতক্ষীরার তরুণ শুভ দাসের মরদেহ অবশেষে নিজ গ্রামে পৌঁছেছে। পরিবারের অভাব ঘোচাতে প্রায় তিন বছর আগে লেবাননে যাওয়া ২৩ বছরের এই যুবককে ফিরতে হলো কফিনবন্দি হয়ে। মরদেহ ফেরাতে কেটে গেছে তিন মাস ২৬ দিন।
রবিবার (৬ সেপ্টেম্বর) সকালে শুভ দাসের মরদেহ সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার কয়লা ইউনিয়নের শ্রীপতিপুর গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়। দীর্ঘ অপেক্ষার পর স্বজনেরা প্রিয়জনকে ফিরে পেলেও সেই ফেরায় ছিল না কোনো আনন্দ, ছিল কান্না আর শোকের ভার।
শুভ দাস ওই গ্রামের জগন্নাথ দাসের ছেলে। চার ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন মেজো। স্বজনদের ভাষ্য, পরিবারের আর্থিক সংকট কাটাতে প্রায় তিন বছর আগে জমি ও বসতভিটা বিক্রি এবং ধারদেনা করে তাকে লেবাননে পাঠানো হয়।
বিদেশে যাওয়ার পেছনে শুভর নিজেরও কিছু স্বপ্ন ছিল। বাবার পুরোনো ঘরটি টালির ছাউনি দিয়ে সংস্কার করবেন, মায়ের থাকার জায়গাটি টিন দিয়ে ঠিক করবেন বলে পরিকল্পনা ছিল তার। পরিবারের সদস্যদের মুখে হাসি ফেরানোর সেই স্বপ্নই শেষ পর্যন্ত আর পূরণ হলো না।
যে হামলায় থেমে যায় তিন বাংলাদেশির জীবন
গত ১২ মে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের নাবাতিয়েহ জেলার জেবদাইন এলাকায় একটি প্রাইভেট বহনকারী গাড়িতে ইসরায়েলি ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটে। হামলায় ঘটনাস্থলেই নিহত হন ওই এলাকায় কর্মরত তিন বাংলাদেশি।
তারা হলেন, সাতক্ষীরা সদর উপজেলার শফিকুল ইসলাম, আশাশুনি উপজেলার নাজিউল ইসলাম নাজিব এবং কলারোয়া উপজেলার শুভ দাস।
তিনজনের মধ্যে অন্য দুজনের মরদেহ গত ১৯ জুন দেশে ফেরানো সম্ভব হলেও শুভর মরদেহ ফেরাতে তৈরি হয় দীর্ঘ অনিশ্চয়তা। প্রশাসনিক জটিলতায় আটকে থাকে মরদেহ দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া।
শেষ পর্যন্ত প্রায় তিন মাস ২৬ দিন পর দেশে ফিরলেন শুভ।
পরিবারের স্বপ্নের বদলে ফিরল মরদেহ
শুভর স্বজনেরা জানান, অভাবের সংসারে কিছুটা স্বস্তি আনতেই তাকে বিদেশে পাঠানো হয়েছিল। পরিবারের জমি ও বসতভিটা বিক্রি এবং ধারদেনা করে লেবাননে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
স্বজনদের আশা ছিল, শুভর উপার্জনে ধীরে ধীরে পরিবারের ঋণ পরিশোধ হবে। বাবার ঘর সংস্কার হবে, মায়ের মাথার ওপর হবে নিরাপদ ছাদ। কিন্তু সেই প্রত্যাশার বিপরীতে এখন পরিবারকে ভাবতে হচ্ছে ধারদেনা পরিশোধের পাশাপাশি প্রিয় সন্তানকে হারানোর শোক সামলানোর কথা।
শুভর মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর পর শ্রীপতিপুর গ্রামে নেমে আসে শোকের আবহ। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ।
একদিকে বিদেশে পাঠাতে নেওয়া ঋণের বোঝা, অন্যদিকে একমাত্র ছেলেকে হারানোর বেদনা ও সংকটে দিশেহারা হয়ে পড়েছে পরিবারটি।
শেষ বিদায়েও সরকারি সহায়তা
শুভর মরদেহ দেশে ফেরার পর তার শেষকৃত্যের প্রস্তুতিতে পরিবারকে সরকারি সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
কলারোয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরিফুল ইসলাম জানান, শববাহী দেহটির জন্য ৬ হাজার টাকা এবং সৎকার সামগ্রীর ব্যবস্থা করতে সরকারি পক্ষ থেকে আরও ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে।
ভাগ্য বদলানোর আশায় যে তরুণ প্রায় তিন বছর আগে বিদেশের পথে পা রেখেছিলেন, তিন মাস ২৬ দিনের অপেক্ষা শেষে তার সেই পথচলা শেষ হলো নিজ গ্রামের উঠোনে, তবে জীবিত অবস্থায় নয়, কফিনবন্দি হয়ে।








