একই পরিবারের ইতিহাসে যেন একই বেদনার পুনরাবৃত্তি। ২০০৩ সালে সৌদি আরবে মারা যান রফিক উদ্দিন। অর্থের অভাবে তার মরদেহ দেশে আনা সম্ভব হয়নি। ২৩ বছর পর তার একমাত্র ছেলে সোহাগও সৌদি আরবে মারা গেলেন। এবারও লাশ দেশে ফিরবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পরিবার। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, পাঁচ বছরের যে মেয়েটি বাবাকে কখনো চোখের সামনে দেখেনি, সে কি অন্তত বাবার মরদেহটি দেখতে পারবে?
নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার মুছাপুর ইউনিয়নের বাংলাবাজার এলাকার রোকসানা আক্তারের কণ্ঠে তাই শুধু ভাই হারানোর শোক নয়, পুরোনো এক ক্ষতও ফিরে এসেছে।
গত সোমবার সৌদি আরবের আবহা শহরে নিজের বাসায় ‘হার্ট অ্যাটাকে’ মারা যান মো. সোহাগ। তার মরদেহ বর্তমানে স্থানীয় একটি হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়েছে। দেশে থাকা স্বজনেরা এখন মরদেহটি দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য চেষ্টা করছেন।
কিন্তু পরিবারের আর্থিক বাস্তবতা আর প্রবাসে মরদেহ দেশে ফেরানোর জটিলতার কারণে সেই অপেক্ষা ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।
যে পরিবার একবার লাশ আনতে পারেনি
সোহাগের বাবা রফিক উদ্দিনও সৌদি আরবে কাজ করতেন। ২০০৩ সালে প্রবাসেই তার মৃত্যু হয়। সে সময় অর্থের সংকটসহ নানা কারণে তার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। সৌদি আরবেই তাকে দাফন করা হয়।
বাবার মৃত্যুর ১৫ বছর পর ২০১৮ সালে সৌদি আরবে যান সোহাগ। ২০২১ সালে একবার দেশে এসেছিলেন। পরে আবার ফিরে যান কর্মস্থলে। এরপর আর দেশে ফেরা হয়নি তার। এখন সোহাগও নেই।
বাবার মতো ছেলেরও যদি বিদেশের মাটিতেই শেষ ঠিকানা হয়, তাহলে একই পরিবারের কাছে দুই প্রজন্মের দুটি মৃত্যুর গল্পই হয়ে থাকবে প্রবাসে শেষ হয়ে যাওয়া জীবনের গল্প।
বাবাকে দেখার সুযোগই হয়নি ছোট মেয়ের
সোহাগের স্ত্রী আমেনা বেগম ও দুই মেয়ে রয়েছে। বড় মেয়ে ফাতেমা জাহান ইকরা, বয়স ১০ বছর। ছোট মেয়ে উম্মে জামিলা ঈশার বয়স পাঁচ বছর।
ঈশার জন্মের আগেই আবার সৌদি আরবে ফিরে গিয়েছিলেন সোহাগ। অর্থাৎ পাঁচ বছর বয়সী এই শিশুটি বাবাকে কখনো সামনাসামনি দেখার সুযোগ পায়নি।
ভাইয়ের মৃত্যুর কথা বলতে গিয়ে বারবার ছোট মেয়েটির প্রসঙ্গই তুলছিলেন রোকসানা আক্তার।
তার প্রশ্ন, যে মেয়ে জীবিত বাবাকে কখনো দেখতে পারেনি, সে কি বাবার মরদেহটিও দেখতে পারবে না?
রোকসানার ভাষায়, বিদেশের মাটিতে পরিবার-পরিজনহীন অবস্থায় যদি ভাইকে দাফন করতে হয়, তাহলে পাঁচ বছরের মেয়েটির জন্য বাবাকে শেষবার দেখার সুযোগটুকুও হারিয়ে যাবে।
পরিবারের একমাত্র আয়ের মানুষটিও নেই
স্বজনেরা জানান, সোহাগ ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার আয়ের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন স্ত্রী, দুই সন্তান ও মা রৌশন আরা বেগম।
হঠাৎ তার মৃত্যুতে পরিবারটি আর্থিকভাবেও বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সোহাগের মৃত্যুর খবর আসার পর থেকেই বাড়িতে চলছে কান্না আর আহাজারি। স্বামী হারানোর শোকে তার স্ত্রী আমেনা বেগম বারবার সংজ্ঞা হারাচ্ছেন বলে জানান স্বজনেরা।
একদিকে প্রিয়জন হারানোর শোক, অন্যদিকে মরদেহ দেশে ফেরানো যাবে কি না, এই দুশ্চিন্তাও পরিবারটির ওপর চাপ তৈরি করেছে।
মৃত্যুর আগে আরেক দুশ্চিন্তায় ছিলেন সোহাগ
স্বজন রোকসানা আক্তারের দাবি, মৃত্যুর আগে সোহাগ নিজেও মানসিকভাবে চাপে ছিলেন। কয়েক মাস আগে তার আকামার মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। পরে পাসপোর্টের মেয়াদও শেষ হয়। এসব কাগজপত্র নবায়ন করতে না পারায় তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন বলে জানান রোকসানা।
এর মধ্যেই আবহায় নিজ বাসায় তার মৃত্যু হয়। তবে তার মৃত্যুর কারণ হিসেবে পরিবার ‘হার্ট অ্যাটাক’-এর কথা জানিয়েছে।
এখন পরিবারের চাওয়া একটাই
রফিক উদ্দিনের মৃত্যুর ২৩ বছর পরও তার কবর পড়ে আছে সৌদি আরবে। এবার তার একমাত্র ছেলে সোহাগের ক্ষেত্রেও যেন একই পরিণতি না হয়, এটাই পরিবারের আকুতি।
রোকসানা আক্তার বলেন, তারা সরকারের সহযোগিতায় সোহাগের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে চান। শেষবারের মতো ভাইয়ের মুখ দেখতে চান স্বজনেরা। নিজেদের এলাকার কবরস্থানে তাকে দাফন করতে চান।
আর সবচেয়ে বেশি করে চান, সোহাগের দুই মেয়ে যেন অন্তত বাবাকে শেষবারের মতো দেখতে পারে। একটি পরিবারের কাছে চাওয়াটা তাই খুব বড় কিছু নয়, বিদেশে কর্মরত অবস্থায় মারা যাওয়া একজন মানুষ যেন মৃত্যুর পর অন্তত নিজের মাটিতে ফিরতে পারেন।








