দেশের বাইরে থেকেও ভোটার হওয়ার সুযোগ পেতে প্রবাসী বাংলাদেশীদের আগ্রহ বাড়ছে। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তথ্য বলছে, ১৪টি দেশের ২৪টি স্টেশনে ভোটার নিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সেবা কার্যক্রমে এখন পর্যন্ত ৫৪ হাজার ৪৭৭ জনের আবেদন অনুমোদিত হয়েছে। তাদের মধ্যে ২৮ হাজারের বেশি প্রবাসীর স্মার্ট এনআইডি কার্ড ছাপিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশে পাঠিয়েছে ইসি।
ইসির এনআইডি অনুবিভাগের আগস্ট মাসের প্রতিবেদনে প্রবাসীদের এনআইডি কার্যক্রমের এ চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে গত ২৭ আগস্ট পর্যন্ত ১৪টি দেশের ২৪টি স্টেশনের তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
আবেদন ৯৯ হাজার, বায়োমেট্রিক শেষ ৬২ হাজারের
ইসির তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট মাসে প্রবাসীদের ভোটার নিবন্ধনের জন্য ৯৯ হাজার ৮১৫টি আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে ৬২ হাজার ৫৮৯ জনের বায়োমেট্রিক তথ্য গ্রহণ করা হয়েছে।
অর্থাৎ আবেদনকারীদের প্রায় ৬৩ শতাংশ ইতোমধ্যে বায়োমেট্রিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন। তবে ৩৭ হাজারের বেশি আবেদনের ক্ষেত্রে এখনো বায়োমেট্রিক গ্রহণ বাকি রয়েছে।
তদন্ত শেষে নিবন্ধন কর্মকর্তারা ৫৪ হাজার ৪৭৭টি আবেদন অনুমোদন করেছেন। আরও ৩ হাজার ৫৩৬টি আবেদন অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। বিপরীতে তদন্ত শেষে ২৬ হাজার ৫৯৫টি আবেদন বাতিল হয়েছে। এই পরিসংখ্যান বলছে, বিপুলসংখ্যক প্রবাসী এনআইডি পাওয়ার প্রক্রিয়ায় এলেও আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের ধাপেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আবেদন বাদ পড়ছে।
তিন দেশেই প্রায় ৬২ হাজার আবেদন
স্টেশনভিত্তিক হিসাবে প্রবাসীদের এনআইডি আবেদনের বড় অংশ এসেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবি ও দুবাই স্টেশনে সবচেয়ে বেশি ২৪ হাজার ৮২৫টি আবেদন জমা পড়েছে। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার ও বার্মিংহাম স্টেশনে আবেদন এসেছে ১৮ হাজার ৬২১টি।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক, মিশিগান, ওয়াশিংটন ডিসি ও লস অ্যাঞ্জেলেস স্টেশনে আবেদন জমা পড়েছে ১৮ হাজার ৪৭২টি। অর্থাৎ এই তিন দেশের স্টেশনগুলোতেই মোট আবেদন হয়েছে প্রায় ৬২ হাজার।
ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যেও বড় অংশগ্রহণ
ইতালিতে প্রায় সাড়ে ৯ হাজার প্রবাসী এনআইডির জন্য আবেদন করেছেন। সৌদি আরবে আবেদন পড়েছে প্রায় ৭ হাজার। কুয়েতের বিভিন্ন কার্যক্রমে ৫ হাজার ৯২১টি, কাতারে ৪ হাজার ৮২৯টি এবং মালয়েশিয়ায় ২ হাজারের বেশি আবেদন পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া কানাডার অটোয়া ও টরন্টো স্টেশনে ৩ হাজার ৭৯৪টি আবেদন এসেছে। ওমানের মাস্কাটে আবেদন পড়েছে ২ হাজার ৫৭৩টি। অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরা ও সিডনি স্টেশনে আবেদন পাওয়া গেছে ১ হাজার ৪৫৯টি। জাপানের টোকিও স্টেশনে আবেদন করেছেন ৩৬৫ জন। এর মধ্যে ২০৮ জনের বায়োমেট্রিক গ্রহণ করা হয়েছে।
মালদ্বীপের মালে স্টেশনে আবেদন এসেছে ৩২৮টি। আর দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিটোরিয়া স্টেশনে আবেদনকারীর সংখ্যা ১৩৯ জন।
ছয় বছর আগে শুরু, এখন ২৪ স্টেশন
প্রবাসীদের ভোটার হিসেবে নিবন্ধন এবং স্মার্ট এনআইডি দেওয়ার উদ্যোগের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ২০১৯ সালে। ওই বছরের ৫ নভেম্বর মালয়েশিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশীদের অনলাইনে ভোটার নিবন্ধন ও স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র দেওয়ার কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়। এর দুই সপ্তাহেরও কম সময় পর ১৮ নভেম্বর সংযুক্ত আরব আমিরাতেও শুরু হয় একই কার্যক্রম।
শুরুতে সীমিত কয়েকটি দেশে কার্যক্রম থাকলেও ধীরে ধীরে এর বিস্তার ঘটেছে। ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে এসে ১৪টি দেশের ২৪টি স্টেশনে প্রবাসীদের ভোটার নিবন্ধন ও এনআইডি সেবা পৌঁছায়।
বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, যুক্তরাজ্য, ইতালি, কুয়েত, কাতার, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, মালদ্বীপ, ওমান ও দক্ষিণ আফ্রিকার বাংলাদেশ মিশনের মাধ্যমে এ সেবা দেওয়া হচ্ছে।
নতুন করে যুক্ত হচ্ছে আরও দেশ
প্রবাসীদের এনআইডি সেবার ভৌগোলিক পরিধি আরও বাড়ানোর উদ্যোগও নিয়েছে ইসি। গত জুলাইয়ে নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, সুইডেন, সিঙ্গাপুর ও বাহরাইনকে কার্যক্রমের আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর মধ্যে ৪ আগস্ট সিঙ্গাপুরে আনুষ্ঠানিকভাবে ভোটার নিবন্ধন ও এনআইডি সেবা চালু হয়েছে।
উদ্বোধনী কার্যক্রমেই তিনজন প্রবাসী বাংলাদেশীর হাতে স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র তুলে দেওয়া হয়।
সংখ্যার বাইরে যে পরিবর্তন
প্রবাসীদের এনআইডি কার্যক্রমের পরিসর বাড়ার অর্থ শুধু আরও বেশি মানুষ জাতীয় পরিচয়পত্র পাচ্ছেন, এমন নয়। দেশের বাইরে থাকা নাগরিকদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়াটিও ধীরে ধীরে বিস্তৃত হচ্ছে।
তবে বিপুলসংখ্যক আবেদন জমা পড়ার পাশাপাশি বায়োমেট্রিক গ্রহণে এখনো বড় একটি অংশ বাকি এবং তদন্ত শেষে হাজার হাজার আবেদন বাতিলও হয়েছে। ফলে সেবার বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে আবেদন যাচাই ও নিবন্ধন প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করাও ইসির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
২০১৯ সালে দুটি দেশ দিয়ে শুরু হওয়া প্রবাসী এনআইডি কার্যক্রম এখন ১৪ দেশে পৌঁছেছে। সামনে আরও পাঁচ দেশ যুক্ত হওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে দেশের বাইরে থাকা বাংলাদেশীদের ভোটার তালিকা ও জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবস্থার আওতায় আনার প্রক্রিয়াটি ধীরে ধীরে আরও বড় পরিসরে যাচ্ছে।








