প্রায় আড়াই বছর বন্ধ থাকার পর মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবার সচল হওয়ার প্রক্রিয়ায়। কিন্তু বাজার খোলার আগেই সামনে এসেছে নতুন বিরোধ। রিক্রুটিং এজেন্সি বাছাই, ‘সিন্ডিকেট’ অভিযোগ এবং শ্রমিক পাঠানোর পদ্ধতি নিয়ে চলছে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য। ব্যবসায়ীদের একাংশের অভিযোগ, একটি মহল আন্দোলন, বিবৃতি ও গণমাধ্যমে বক্তব্যের মাধ্যমে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করছে, যা শেষ পর্যন্ত বৈধ পথে কর্মী পাঠানোর উদ্যোগকেই প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।
অন্যদিকে সমালোচকদের অভিযোগ, সীমিতসংখ্যক রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে শ্রমিক পাঠানোর সিদ্ধান্ত স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতার প্রশ্ন তৈরি করেছে। ফলে মালয়েশিয়ার বাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের প্রবেশের আগে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে, এবারের অভিবাসন প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ, কতটা কম খরচের এবং শ্রমিকের স্বার্থে কতটা নিরাপদ হবে?
১৫ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের জন্য ২৫ এজেন্সি
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশসহ ১৫টি দেশ থেকে কর্মী নেয় মালয়েশিয়া। দেশটির মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কর্মী সরবরাহকারী প্রধান পাঁচটি দেশের মধ্যে নেপাল ও বাংলাদেশের জন্য ২৫টি করে রিক্রুটিং এজেন্সিকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ভারত, পাকিস্তান ও মিয়ানমারের জন্য অনুমোদিত এজেন্সির সংখ্যা ১০টি করে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সরকার শর্ত পূরণ করা ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সির পাশাপাশি ৩১২টি সহযোগী এজেন্সিকে যুক্ত করেছে। সব মিলিয়ে ৩৩৮টি এজেন্সি বাংলাদেশ থেকে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়ায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য, কোন দেশ থেকে কতটি এজেন্সি কর্মী পাঠাবে, এটি মালয়েশিয়া সরকারের নিজস্ব নীতিগত সিদ্ধান্ত।
তবে বাংলাদেশে এই সিদ্ধান্ত ঘিরে ‘সিন্ডিকেট’ শব্দটি বারবার সামনে আসছে। ব্যবসায়ীদের একাংশের প্রশ্ন, অন্য সোর্স কান্ট্রির ক্ষেত্রে একই ধরনের সীমিত এজেন্সি ব্যবস্থাকে ঘিরে তেমন বিতর্ক না থাকলেও বাংলাদেশে কেন বিষয়টি এতটা রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক বিরোধের রূপ নিচ্ছে?
শ্রমবাজার বন্ধের কারণ নিয়ে ভিন্ন বক্তব্য
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে বিতর্কের অন্যতম কেন্দ্র ২০২৪ সালের ৩১ মে। ব্যবসায়ীদের একাংশের দাবি, ওই সময় শ্রমিক নেওয়া বন্ধ হওয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো নির্দিষ্ট রিক্রুটিং সিন্ডিকেটের অনিয়মকে এককভাবে দায়ী করা ঠিক নয়। কারণ, একই সময়ে বাংলাদেশ ছাড়াও মালয়েশিয়ার অন্য সোর্স কান্ট্রিগুলো থেকে কর্মী নেওয়া বন্ধ করা হয়েছিল।
তাদের বক্তব্য, মালয়েশিয়া সরকার ‘ফরেন ওয়ার্কার ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান’-এর আওতায় সব দেশ থেকেই কর্মী গ্রহণ বন্ধ রেখেছিল।
একজন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীর ভাষ্য, ২০২২ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৩১ মে পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে যেসব কর্মী মালয়েশিয়ায় গেছেন, তাদের অভিবাসন প্রক্রিয়া অন্য অনেক দেশের তুলনায় নিরাপদ ছিল।
তবে শ্রমবাজারের অতীত ব্যবস্থাপনা নিয়ে অভিযোগ রয়েছে অন্য পক্ষেরও। ফলে নতুন করে বাজার খোলার আগে পুরোনো অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ যাচাই এবং ভবিষ্যৎ প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি নিশ্চিত করাই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
‘সিন্ডিকেট’ বিতর্কের কেন্দ্রে কারা?
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে সাম্প্রতিক বিরোধে বায়রার সাবেক নেতা ফখরুল ইসলাম এবং বায়রার বিলুপ্ত কমিটির যুগ্ম মহাসচিব ও সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি রিয়াজুল ইসলামের নাম সামনে আনছেন ব্যবসায়ীদের একটি অংশ।
তাদের অভিযোগ, এসব ব্যক্তি বিভিন্ন বক্তব্য, সভা, সমাবেশ ও কর্মসূচির মাধ্যমে শ্রমবাজার পুনরায় চালুর প্রক্রিয়া নিয়ে নেতিবাচক পরিস্থিতি তৈরি করছেন। তবে এই অভিযোগগুলো মূলত ব্যবসায়ীদের বক্তব্যনির্ভর। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ছাড়া এসব অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
ফখরুলকে ঘিরে পাল্টা অভিযোগ
ব্যবসায়ীদের একাংশ ফখরুল ইসলামের অতীত ব্যবসায়িক ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন। তাদের অভিযোগ, আগের সরকারের সময়ে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর ১০১টি এজেন্সির কাঠামোর সঙ্গে ফখরুলের ব্যবসায়িক স্বার্থ যুক্ত ছিল। তার প্রতিষ্ঠান ওয়েলকাম মেডিক্যাল সেন্টার মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং প্রায় ৭০ হাজার কর্মীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা থেকে কোটি কোটি টাকা আয় করা হয়েছে বলে ব্যবসায়ীদের দাবি।
তারা আরও দাবি করেন, ১০১টি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকায় ফখরুলের অন্তত দুটি লাইসেন্স ছিল। ত্রিবেণী ইন্টারন্যাশনাল ও সেলিব্রেটি ইন্টারন্যাশনাল নামের প্রতিষ্ঠান দুটির মালিকানা অন্য ব্যক্তিদের নামে থাকলেও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এর নেপথ্যে ফখরুলের অংশীদারত্ব ছিল।
এ ছাড়া সহযোগী রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকাতেও তার এজেন্সি ও ওয়েলকাম মেডিক্যাল সেন্টারের সংশ্লিষ্টতা ছিল বলে তারা দাবি করছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে ফখরুল ইসলামের বক্তব্য এখানে পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর স্বাধীন যাচাই ছাড়া এগুলোকে প্রমাণিত তথ্য হিসেবে বিবেচনা করা যাচ্ছে না।
আরেক ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধেও গুরুতর অভিযোগ
শ্রমবাজারের বিরোধে আফিফা ওভারসিজের মালিক আলতাফ খানের নামও সামনে এসেছে। ব্যবসায়ীদের একটি অংশের দাবি, মালয়েশিয়ায় ‘কাউন্টার সেটিং’-এর মাধ্যমে অবৈধভাবে কর্মী পাঠানোর অভিযোগে দেশটির দুর্নীতি দমন কমিশন তাকে গ্রেপ্তার করেছিল।
তাদের যুক্তি, বৈধ ও সরকারি কাঠামোয় শ্রমিক পাঠানোর প্রক্রিয়া শক্তিশালী হলে অবৈধ পথে কর্মী পাঠানোর সুযোগ কমবে। সেই কারণে একটি মহল নতুন ব্যবস্থার বিরোধিতা করছে। এ ক্ষেত্রেও অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।
ব্যবসায়ীদের পাল্টা যুক্তি: অন্য দেশেও খরচ কম নয়
মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানো নিয়ে খরচের প্রশ্নও বিতর্কের বড় জায়গা। ব্যবসায়ীদের একাংশ বলছেন, সৌদি আরব, কাতার, ওমান এমনকি সিঙ্গাপুরে যেতে একজন কর্মীর ৬ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। অথচ এসব দেশের ন্যূনতম মজুরি মালয়েশিয়ার তুলনায় কম।
তাদের প্রশ্ন, অন্যান্য শ্রমবাজারে অভিবাসন ব্যয় নিয়ে যে ধরনের আলোচনা দেখা যায় না, মালয়েশিয়ার ক্ষেত্রেই কেন ‘সিন্ডিকেট’ অভিযোগকে সামনে রেখে পুরো বাজারকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে?
তবে এখানেই শ্রমিকের স্বার্থের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে, অন্য দেশে বেশি খরচ হয় বলেই মালয়েশিয়ায় বেশি খরচ গ্রহণযোগ্য হয়ে যায় কি না। বরং নতুন বাজার খোলার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অভিবাসন ব্যয় যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা এবং প্রতিটি লেনদেনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।
সরকারের দাবি, আলোচনার পথেই এগোচ্ছে প্রক্রিয়া
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় বলছে, কম খরচে নিরাপদ অভিবাসনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের পাশাপাশি সরকারপ্রধান পর্যায়েও নিরাপদ অভিবাসন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এসব দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্ত করার প্রক্রিয়া এগিয়েছে বলে মন্ত্রণালয়ের দাবি।
মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বর দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকে বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সি বাছাইয়ের দায়িত্ব মালয়েশিয়া সরকারের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছিল। ওই সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত।
ফলে মালয়েশিয়ার নির্ধারিত শর্ত ও নীতিমালার বাইরে গিয়ে বাংলাদেশ একতরফাভাবে এজেন্সি বাছাইয়ের কাঠামো পরিবর্তন করতে পারে না।
সবচেয়ে বড় পরীক্ষার জায়গা: শ্রমিকের খরচ
নতুন করে বাজার খোলার আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সম্ভবত এখানেই, শ্রমিককে মালয়েশিয়া যেতে মোট কত টাকা খরচ করতে হবে?
সরকার বলছে, তাদের প্রচেষ্টায় মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষ ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মীকে ‘জিরো কস্টে’ নেওয়ার বিষয়ে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে।
এই কর্মীদের বিমানভাড়াসহ অভিবাসন ব্যয় ছাড়াই মালয়েশিয়ায় পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথম দফার কর্মীদের সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের (বোয়েসেল) মাধ্যমে বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইটে পাঠানোর কথা রয়েছে।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে এটি হতে পারে নতুন শ্রমবাজার ব্যবস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। কারণ ‘জিরো কস্ট’ শুধু ঘোষণায় সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি বাস্তবেই শ্রমিকের কাছ থেকে কোনো অভিবাসন ব্যয় নেওয়া হবে না, সেটিই হবে নজরদারির বিষয়।
সামনে বাজার, পেছনে পুরোনো বিতর্ক
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধু ‘সিন্ডিকেট বনাম সরকার’ বা ‘ব্যবসায়ী বনাম ব্যবসায়ী’ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না।
একদিকে প্রায় আড়াই বছর বন্ধ থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার আবার খুলছে। দেশে কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে আগের ব্যবস্থাপনা, এজেন্সি বাছাই, অভিবাসন ব্যয় এবং ব্যবসায়িক স্বার্থ নিয়ে প্রশ্নও রয়েছে।
তাই নতুন করে বাজার খোলার সাফল্য নির্ভর করবে কতজন কর্মী পাঠানো হলো, শুধু তার ওপর নয়; বরং তারা কত কম খরচে, কতটা নিরাপদে এবং কতটা স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় মালয়েশিয়ায় যেতে পারলেন, তার ওপর।
শ্রমবাজার নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগের আড়ালে এই প্রশ্নটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ: এবার কি কর্মী পাঠানোর পুরো প্রক্রিয়াটি এমনভাবে পরিচালিত হবে, যেখানে সরকার, রিক্রুটিং এজেন্সি ও মালয়েশিয়ার নিয়োগকর্তার পাশাপাশি সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে থাকবে সেই বাংলাদেশি কর্মী, যার ঘামেই শেষ পর্যন্ত এই শ্রমবাজারের অর্থনীতি দাঁড়িয়ে থাকে?
সূত্র: দেশ রূপান্তর








