যুদ্ধ ও আঞ্চলিক সংকটে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন বেশকিছু প্রবাসী বাংলাদেশি। এর মধ্যে যেসব কর্মীর ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে, তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনই চূড়ান্ত সমাধানের কথা বলতে পারছে না সরকার। সৌদি আরবের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর দেশটির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে ভিসার মেয়াদ বাড়ানোসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর। তবে কবে নাগাদ এই আলোচনা শুরু হবে, কতজন কর্মী এর আওতায় আসবেন কিংবা ভিসা বাড়ানোর বিষয়ে সৌদি আরবের অবস্থান কী সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি সরকারের এই প্রতিমন্ত্রীর কাছে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের প্রভাব বাংলাদেশের অভিবাসী কর্মীদের কর্মসংস্থান ও অবস্থানসংক্রান্ত অনিশ্চয়তাকে আরও জটিল করে তুলছে। বিশেষ করে যাদের ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে, তাদের জন্য সময়মতো সমাধান না এলে কী পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, তা নিয়ে উদ্বেগের অবকাশ রয়েছে। এ অবস্থায় সরকারের তাৎক্ষণিক কোনো সিদ্ধান্তের পরিবর্তে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজার পরিকল্পনাই সামনে এসেছে।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) ৩০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত ‘সোনার মানুষ সম্মিলন ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর।
তিনি জানান, অতীতেও এ ধরনের সমস্যা সমাধানে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা হয়েছে। কিন্তু সৌদি আরব বর্তমানে নিজেরাই দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাওয়ায় এখন আলোচনার উপযুক্ত সময় নয় বলে মনে করছেন তিনি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে কর্মীদের কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করতে ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর মতো বিষয় নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।
প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে সমাধানের সম্ভাবনার কথা থাকলেও তা বাস্তবায়নের সময়সূচি কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্মীদের জন্য নির্দিষ্ট কোনো আশ্বাসের উল্লেখ নেই। ফলে ভিসার মেয়াদ শেষ হতে থাকা কর্মীদের ক্ষেত্রে আলোচনার ফল কী হবে, তা নির্ভর করছে পরিস্থিতির পরিবর্তন এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সম্ভাব্য সমঝোতার ওপর।
যুদ্ধ-পরবর্তী কর্মসংস্থানের আশা, তবে অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে কিছু বাংলাদেশি কর্মী কর্মহীন হয়ে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন নুরুল হক নুর। তার আশা, যুদ্ধ শেষ হলে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলগুলোতে পুনর্গঠন কার্যক্রম শুরু হবে। এতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে এবং বাংলাদেশি কর্মীদের জন্যও সম্ভাবনা তৈরি হবে।
তবে পুনর্গঠন কার্যক্রমে বাংলাদেশি কর্মীরা কীভাবে যুক্ত হবেন, কোন খাতে তাদের চাহিদা তৈরি হতে পারে কিংবা এ বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে কি না, সে সম্পর্কে প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে যুদ্ধ-পরবর্তী কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা থাকলেও তা এখনো ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল।
এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও বিকল্প শ্রমবাজার খুঁজে বের করার উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। পাশাপাশি দেশে ফিরে আসা কর্মীদের প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসনে সরকার কাজ করছে বলেও জানান তিনি। অর্থাৎ, বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ ধরে রাখার পাশাপাশি দেশে ফিরে আসা কর্মীদের জন্য বিকল্প প্রস্তুতির বিষয়টিও সরকারের বিবেচনায় রয়েছে।
চিকিৎসা ও মরদেহ ফেরাতে সহযোগিতা, সক্রিয় দূতাবাস
চলমান যুদ্ধের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশিদের চিকিৎসা এবং নিহতদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ সহযোগিতা করছে বলে জানিয়েছেন নুরুল হক নুর। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দূতাবাসও আগের তুলনায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে বলে তার দাবি।
প্রতিমন্ত্রী জানান, রিয়াদে হামলার পর বাংলাদেশ দূতাবাসের রাষ্ট্রদূতসহ জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বাংলাদেশিদের খোঁজখবর নিয়েছেন।
এই সহযোগিতা সংকটের মধ্যে প্রবাসীদের জরুরি মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তবে কতজন বাংলাদেশি চিকিৎসা পেয়েছেন, কতজন নিহত হয়েছেন কিংবা কতজনের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে, তার সঠিক সংখ্যাও উল্লেখ করেননি তিনি।
সংকটে সৌদি আরবের পাশে থাকার বার্তা
যুদ্ধে নিহত ও ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশিদের সহায়তার প্রসঙ্গে সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কথা তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। তার বক্তব্য, সৌদি আরব বাংলাদেশের পরীক্ষিত বন্ধু রাষ্ট্র। দেশটি যখন নিজেরাই সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন শুধু সহযোগিতা চাওয়ার পরিবর্তে তাদের পাশে দাঁড়ানোও বাংলাদেশের নৈতিক দায়িত্ব।
তবে প্রবাসী কর্মীদের ভিসার মেয়াদ বাড়ানো, কর্মস্থলে ফেরার সুযোগ এবং নতুন কর্মসংস্থানের বিষয়ে সমাধান পেতে হলে কূটনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সময়সীমাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।








