সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬

সবশেষ

রিয়াদগামী ফ্লাইট বন্ধ, বিকল্প টিকিটে বাড়তি চাপ: চাকরি-ভিসা হারানোর শঙ্কায় হাজারো প্রবাসী

সৌদি আরবে কর্মস্থলে ফেরার সময়সীমা ঘনিয়ে আসছে, অথচ হাতে থাকা টিকিটে যাত্রা অনিশ্চিত। বিকল্প পথে যাওয়ার চেষ্টা করলেও বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে কয়েক গুণ বেশি ভাড়া। একদিকে নিয়োগকর্তার কাছে নির্ধারিত সময়ে পৌঁছানোর চাপ, অন্যদিকে ভিসার মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ার দুশ্চিন্তায় পড়েছেন সৌদিগামী বাংলাদেশি প্রবাসীরা।

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলার পর ফ্লাইট চলাচল ব্যাহত হওয়ায় ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আটকে পড়েছেন ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফেরার অপেক্ষায় থাকা শত শত যাত্রী। একই পরিস্থিতিতে রিয়াদে দেশে ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন হাজারো বাংলাদেশি। সংকটের মধ্যে বিকল্প রুটের টিকিটের দাম বেড়ে যাওয়ায় যাত্রা অব্যাহত রাখার চেষ্টা অনেকের জন্য আর্থিকভাবে কঠিন হয়ে উঠেছে।

সৌদি প্রবাসী আব্দুল্লাহ আল মামুনের আশঙ্কা, নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে পৌঁছাতে না পারলে চাকরি হারাতে পারেন তিনি। তার ভাষ্য, নিয়োগকর্তা বা কফিল তাকে ফেরত পাঠিয়ে দিতে পারেন। এ কারণে ভারতের মুম্বাই হয়ে ট্রানজিট ফ্লাইটে যাওয়ার কথা ভাবলেও ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর চাওয়া ভাড়া তার সাধ্যের বাইরে চলে গেছে।

মামুনের মতো আরও অনেক প্রবাসী এখন বিকল্প পথে সৌদি আরবে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু অতিরিক্ত ভাড়া, ফ্লাইটের অনিশ্চয়তা এবং কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার সময়সীমা তাদের সংকট আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

বাতিল ১০ ফ্লাইট, ঢাকায় প্রায় ৩ হাজার যাত্রীর অনিশ্চয়তা
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত শনিবার (১০ অক্টোবর) রাত থেকে রোববার (১১ অক্টোবর) রাত পর্যন্ত ঢাকা-রিয়াদ রুটে অন্তত ১০টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এসব ফ্লাইট পরিচালনার কথা ছিল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস, সৌদিয়া, রিয়াদ এয়ার ও শ্রীলঙ্কান এয়ারলাইনসের।

সোমবার (১২ অক্টোবর) শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ফ্লাইট ম্যানেজমেন্ট শাখার এএসএম স্কোয়াড্রন লিডার সাকিব ফ্লাইট বাতিলের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

এর ফলে ঢাকায় সৌদি আরবগামী প্রায় ৩ হাজার যাত্রী অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। অন্যদিকে, রিয়াদে দেশে ফেরার অপেক্ষায় আটকে রয়েছেন আরও প্রায় ৪ হাজার বাংলাদেশি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

এই পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের সামনে কয়েকটি সমস্যা একসঙ্গে হাজির হয়েছে। যাদের ছুটি শেষ, তাদের দ্রুত কর্মস্থলে ফিরতে হবে। কারও কারও ভিসার মেয়াদও শেষের দিকে। আবার নতুন করে টিকিট কেনার সামর্থ্য না থাকায় বিকল্প পথে যাত্রা করাও সম্ভব হচ্ছে না।

বিকল্প রুটে টিকিটের দামই এখন বড় বাধা
রিয়াদগামী ফ্লাইট বাতিল হওয়ার পর যাত্রীরা ঢাকা থেকে জেদ্দা বা মদিনাগামী ফ্লাইট এবং ভারতের মুম্বাই হয়ে ট্রানজিট রুটের খোঁজ করছেন। উদ্দেশ্য একটাই, যেভাবেই হোক নির্ধারিত সময়ে সৌদি আরবে পৌঁছানো।

কিন্তু যাত্রীদের অভিযোগ, বিকল্প রুটে টিকিটের দাম কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। ফলে আগে কেনা টিকিটের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ জোগাড় করা অনেকের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

সৌদি প্রবাসী মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন জানান, তার ভিসার মেয়াদ আর মাত্র তিন দিন রয়েছে। রিয়াদ বিমানবন্দরে কার্যক্রম বন্ধ থাকার খবর পেয়ে তিনি জেদ্দা বা মদিনা হয়ে যাওয়ার জন্য টিকিট খুঁজছেন। কিন্তু ট্রাভেল এজেন্সিগুলো যে অতিরিক্ত ভাড়া চাইছে, তা বহন করার সামর্থ্য তার নেই।

জসিম উদ্দিনের ভাষ্য, এ অবস্থায় সরকারের দ্রুত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। তা না হলে তার মতো প্রবাসীরা আর্থিকভাবে বড় ক্ষতির মুখে পড়বেন।

তবে বিকল্প রুটের টিকিটের দাম ঠিক কতটা বেড়েছে, কোন কোন এজেন্সি অতিরিক্ত ভাড়া নিচ্ছে এবং এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জমা পড়েছে কি না, এসব বিষয়ে নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।

অতিরিক্ত টাকা খরচ করেও যাত্রা নিশ্চিত নয়
বিকল্প পথে যাওয়ার জন্য বেশি দামে টিকিট সংগ্রহ করতে পারলেও যাত্রীদের দুশ্চিন্তা শেষ হচ্ছে না। নতুন রুটের ফ্লাইট নির্ধারিত সময়ে ছাড়বে কি না, সৌদি আরবে অবতরণে কোনো বাধা থাকবে কি না, এসব প্রশ্নের উত্তর নিশ্চিত না হওয়ায় অনেকেই সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না।

বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকায় আসা যাত্রীদের কেউ কেউ বিমানবন্দরে রাত কাটাচ্ছেন। কেউ অপেক্ষা করছেন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার, আবার কেউ বাড়ি ফিরে যাবেন কি না, তা নিয়ে দ্বিধায় রয়েছেন।

এ অবস্থায় যাত্রীদের ভোগান্তি শুধু ফ্লাইট বাতিলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। নতুন টিকিটের সম্ভাব্য খরচ, ঢাকায় থাকা-খাওয়ার ব্যয় এবং কর্মস্থলে দেরিতে পৌঁছানোর পরিণতিতে আর্থিক ও মানসিক চাপ বাড়ছে।

রিফান্ড ও তারিখ পরিবর্তনের অপেক্ষায় যাত্রীরা
বিমানবন্দর কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট বিমান সংস্থাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের তথ্য সংগ্রহ করছে। ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় টিকিটের অর্থ ফেরত নেওয়া কিংবা যাত্রার তারিখ পরিবর্তনের জন্য বিভিন্ন এয়ারলাইনসের কাউন্টারে যাত্রীদের ভিড় দেখা গেছে।

তবে রিয়াদ বিমানবন্দরে ফ্লাইট চলাচল কখন পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত আশ্বাস পাওয়া যায়নি।

কর্তৃপক্ষ যাত্রীদের পরবর্তী ফ্লাইটের সময় নিশ্চিত না হয়ে বিমানবন্দরে ভিড় না করার পরামর্শ দিয়েছে। একই সঙ্গে নিজ নিজ বিমান সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ রেখে সর্বশেষ সময়সূচি জেনে নিতে বলা হয়েছে।

কিন্তু যাদের ভিসার মেয়াদ দ্রুত শেষ হচ্ছে কিংবা কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার নির্দিষ্ট সময়সীমা রয়েছে, তাদের জন্য শুধু অপেক্ষা করাই সহজ সমাধান নয়। দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত না হলে তাদের ব্যক্তিগত ও আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে বাড়ছে অনিশ্চয়তা
রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ১২ অক্টোবর বাংলাদেশ সময় ভোর ৩টা পর্যন্ত বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের পক্ষ থেকে সৌদি আরবের বিমানবন্দর এড়িয়ে চলার সতর্কবার্তার খবরও সামনে এসেছে। ফলে আঞ্চলিক আকাশপথের নিরাপত্তা এবং ফ্লাইট চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার সময় নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

তবে বিমানবন্দর পুনরায় চালুর নির্দিষ্ট সময়, ঢাকা-রিয়াদ রুটের নিয়মিত ফ্লাইট কবে পুরোপুরি চালু হবে এবং বাতিল হওয়া যাত্রীদের কীভাবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গন্তব্যে পাঠানো হবে, এসব বিষয়ে চূড়ান্ত তথ্য পাওয়া যায়নি।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে নির্ভরযোগ্য তথ্য, বিকল্প যাত্রার বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা এবং টিকিটের অর্থ ফেরত বা তারিখ পরিবর্তনের স্পষ্ট নির্দেশনা। বিশেষ করে যাদের চাকরি ও ভিসার সময়সীমা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা জরুরি।

রিয়াদে হামলার পর সৃষ্ট ফ্লাইট-সংকট তাই শুধু আকাশপথে যোগাযোগের বিঘ্ন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে হাজারো প্রবাসীর কর্মসংস্থান, ভিসার বৈধতা এবং পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তার প্রশ্ন।

প্রতিবেদনটি সরবরাহ করা তথ্য, যাত্রীদের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতির ভিত্তিতে পুনর্লিখিত। বিকল্প রুটের ভাড়া বৃদ্ধির সুনির্দিষ্ট পরিমাণ ও ফ্লাইট স্বাভাবিক হওয়ার সময় স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *