প্রবাসে কাজ না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে সংসারে টাকা পাঠাতে পারছিলেন না বাবা। চার সদস্যের পরিবারের খরচ চালাতে তাই অল্প বয়সেই উপার্জনের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন ১৮ বছরের মো. ফয়সাল। কুমিল্লার দেবিদ্বারের একটি কাপড়ের দোকানে কাজ করে পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিলেন তিনি। কিন্তু সোমবার সকালে কর্মস্থলে যাওয়ার পথেই সড়ক দুর্ঘটনায় থেমে গেল তার জীবন। যে ছেলের আয়ে সংসার চলত, তার আকস্মিক মৃত্যুতে এখন শোকের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছে পরিবারটি।
সোমবার (১২ অক্টোবর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কুমিল্লা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কের দেবিদ্বার উপজেলার জাফরগঞ্জ ইউনিয়নের ছগুড়া-হাতিমারা এলাকায় বাস ও মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে ফয়সাল নিহত হন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনায় মোটরসাইকেলচালক ফয়সাল ঘটনাস্থলেই মারা যান।
নিহত ফয়সাল কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার পারুয়ারা গ্রামের জমশের বাড়ির বাসিন্দা। তার বাবা খোরশেদ আলম সৌদি আরবপ্রবাসী। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, প্রবাসে কাজ না থাকায় বাবা নিয়মিত অর্থ পাঠাতে পারছিলেন না। সেই পরিস্থিতিতে সংসারের খরচ জোগাতে ফয়সাল দেবিদ্বার জেলা পরিষদ মার্কেটের একটি কাপড়ের দোকানে কাজ শুরু করেন।
সকালে বেরিয়েছিলেন কাজে, ফিরলেন নিথর দেহে
পরিবারের সদস্যদের কাছে সোমবার সকালটিও ছিল অন্য দিনের মতোই। মোটরসাইকেল নিয়ে কর্মস্থলের উদ্দেশে বাড়ি থেকে বের হন ফয়সাল। কিন্তু কর্মস্থলে আর পৌঁছানো হয়নি তার।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দেবিদ্বারমুখী একটি মোটরসাইকেলের সঙ্গে কুমিল্লাগামী মর্ডান পরিবহনের একটি বাসের সংঘর্ষ হয়। এতে মোটরসাইকেলচালক ফয়সাল গুরুতরভাবে আহত হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান।
পরিবারের সদস্যরা জানান, পরে তারা ফয়সালের দুর্ঘটনার খবর পান। সকালে স্বাভাবিকভাবে বাড়ি থেকে বের হওয়া ছেলেটির মৃত্যুর সংবাদ মুহূর্তেই তাদের জীবন বদলে দেয়।
যে ছেলের আয়ে চলত সংসার, তার মৃত্যুতে দিশাহারা পরিবার
ফয়সালের বয়স ছিল মাত্র ১৮ বছর। এই বয়সে তার নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার সময় হলেও পরিবারের আর্থিক সংকট তাকে উপার্জনের দায়িত্ব নিতে বাধ্য করেছিল। বাবার আয় অনিয়মিত হয়ে পড়ায় কাপড়ের দোকানে কাজ করে সংসারের ব্যয় মেটাতে সহযোগিতা করতেন তিনি।
তার মৃত্যুর পর পরিবারটি একদিকে সন্তান হারানোর শোক সামলাচ্ছে, অন্যদিকে সামনে কীভাবে সংসার চলবে, সেই প্রশ্নেও পড়েছে অনিশ্চয়তায়। পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী তরুণটির আকস্মিক চলে যাওয়া তাদের আর্থিক সংকট আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
ফয়সালের ছোট ভাই সিয়ামের বয়স ১৪ বছর। সে জানায়, সোমবার সকালে খাওয়া-দাওয়া করে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন তার ভাই। পরে তারা খবর পান, ফয়সাল সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন।
সন্তানের মৃত্যুতে শোকে ভেঙে পড়েছেন মা
ফয়সালের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তার বাড়িতে স্বজন ও প্রতিবেশীদের ভিড় জমে। স্থানীয়দের ভাষ্য, সন্তানের মৃত্যুর শোক সইতে না পেরে তার মা বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন। স্বজনদের আহাজারিতে বাড়িতে শোকাবহ পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
পরিবারটির কাছে ফয়সাল শুধু একজন সন্তান ছিলেন না; বাবার অনুপস্থিতিতে সংসারের দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া একজন নির্ভরতার মানুষও ছিলেন। তার মৃত্যুতে সেই ভরসা হারিয়ে পরিবারটি এখন গভীর শোকের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
ঘাতক বাসের সন্ধান মেলেনি, অভিযোগের অপেক্ষায় পুলিশ
দুর্ঘটনার বিষয়ে মিরপুর হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আনিছুর রহমান বলেন, ঘটনাস্থলে পুলিশের একটি দল পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট বাসটিকেও খুঁজে পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ, বাস ও মোটরসাইকেলের সংঘর্ষ কীভাবে ঘটেছে এবং এ ঘটনায় কারও দায় রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে।
ফয়সালের মৃত্যুতে তার পরিবারের সামনে এখন দুটি কঠিন বাস্তবতা, প্রিয়জন হারানোর অপূরণীয় শোক এবং সংসারের আর্থিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা। কর্মস্থলে যাওয়ার পথে ঘটে যাওয়া একটি দুর্ঘটনা অল্প বয়সী এই তরুণের জীবন কেড়ে নেওয়ার পাশাপাশি তার পরিবারের নির্ভরতার জায়গাটিও শূন্য করে দিয়েছে।
প্রতিবেদনটি পরিবারের বক্তব্য, প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা, স্থানীয় সূত্র এবং পুলিশের বক্তব্যের ভিত্তিতে তৈরি। দুর্ঘটনার কারণ ও দায় নির্ধারণের বিষয়টি তদন্তসাপেক্ষ।








