যুদ্ধ চলছে। হামলায় প্রাণহানির খবর আসছে। সৌদি আরবে ফেরার কথা ভাবতেই বুক কাঁপছে তাদের। তারপরও দেশে থেকে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারও ভিসার মেয়াদ শেষ হতে আর মাত্র কয়েক দিন বাকি, কারও ছুটি শেষ হয়ে গেছে। নির্ধারিত ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় এখন বিকল্প পথে সৌদি আরবে ফেরার চেষ্টা করছেন কেউ কেউ। আবার কেউ টিকিট পরিবর্তন করতে ছুটছেন এয়ারলাইন্সের কাউন্টারে।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গিয়ে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে দেখা যায় সৌদি আরবফেরত প্রবাসীদের। তাদের চোখেমুখে ছিল যুদ্ধের আতঙ্ক, সঙ্গে দেশে আটকে পড়ার দুশ্চিন্তা। সৌদি আরবে ফিরতে না পারলে চাকরি, ভিসা কিংবা আয়ের পথ নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়ার আশঙ্কা তাদের।
ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের হামলার প্রেক্ষাপটে সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে ফ্লাইট চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এর প্রভাব পড়েছে ঢাকা থেকে সৌদিগামী যাত্রীদের ওপরও। একের পর এক ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন ছুটিতে দেশে আসা প্রবাসীরা।
‘যুদ্ধ হচ্ছে, মানুষ মরছে, তারপরও যেতে হবে’
বরিশালের বাসিন্দা হাবিল খানের বুধবার দুপুরে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে রিয়াদ যাওয়ার কথা ছিল। ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় তার যাত্রা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বিমানবন্দরে কথা হয় তার সঙ্গে।
হাবিল বলেন, ‘আমার ভিসার মেয়াদ আর তিন দিন আছে। ২১ তারিখ পর্যন্ত ফ্লাইট বাতিল আছে। আমি এখন কীভাবে যাব? চেষ্টা করছি টিকিট পরিবর্তন করতে।’
ছুটি বাড়ানো কিংবা ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ তার হাতে নেই বলে জানান তিনি। তার কথায়, ‘যেকোনো মূল্যেই যেতে হবে।’
যুদ্ধের মধ্যে কেন সৌদি আরবে ফিরতে চান, এমন প্রশ্নের জবাবে হাবিল বলেন, ‘যুদ্ধ হচ্ছে, মানুষ মরছে। তারপরও যেতে চাচ্ছি কেন? কারণ, জীবন-জীবিকার তাগিদে। এটা ছাড়া আমার আর কোনো উপায় নেই।’
হাবিলের মতোই অনিশ্চয়তায় পড়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দিদারুল আলম। বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে তার দাম্মাম যাওয়ার কথা ছিল। ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় আপাতত দেশে আটকে আছেন তিনি।
দিদারুল বলেন, তার ভিসার মেয়াদ থাকলেও ছুটি শেষ হয়ে গেছে। তাই দ্রুত সৌদি আরবে ফেরা জরুরি। তাকে ২০ তারিখের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে কীভাবে যাওয়া যায়, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন তিনি।
যুদ্ধের মধ্যে যাওয়ার ঝুঁকি নিয়ে দিদারুলের বক্তব্য, ‘দেশে কী কাজ করব? ভয় আছে, তারপরও যেতে হবে। জীবন চালাতে হবে, বাড়ি চালাতে হবে।’
ছেলেকে পাঠাতে চান না বাবা, কিন্তু ফেরার সিদ্ধান্তে অনড়
নোয়াখালীর আরাফাতের ফ্লাইটও বাতিল হয়েছে। তবে সৌদি আরবে ফেরার বিকল্প পথ খুঁজছেন তিনি। তার সঙ্গে বিমানবন্দরে এসেছিলেন বাবা আকবর হোসেন।
ছেলেকে যুদ্ধের মধ্যে পাঠাতে চান না আকবর। কিন্তু আরাফাতের সিদ্ধান্ত বদলাতে পারছেন না তিনি।
আকবর হোসেন বলেন, ‘আমার ছেলেকে যেতেই দিতে চাই না। আমার মন কোনোভাবেই তাকে যেতে দেওয়ার পক্ষে না। সেখানে বোমা মারছে, মানুষ মরছে, ছেলেকে কীভাবে দিই? কিন্তু ছেলে কথা শুনবে না। অনেক টাকা খরচ করে গেছে। এখনো টাকাও ওঠেনি।’
এই একটি পরিবারের উদ্বেগের মধ্যেই ফুটে উঠেছে প্রবাসী শ্রমিকদের সংকটের আরেকটি দিক। বিদেশে যাওয়ার পেছনে যে অর্থ ব্যয় হয়েছে, তা উঠে আসার আগেই দেশে আটকে পড়লে আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়। অন্যদিকে, নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে ফিরতে না পারার কারণে চাকরি ও ভিসার বিষয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে উদ্বিগ্ন তারা।
৮৬ ফ্লাইটে বিঘ্ন, ভোগান্তিতে ১৩ হাজার ৪৯০ যাত্রী
প্রবাসীদের ব্যক্তিগত এই অনিশ্চয়তার পেছনে রয়েছে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন। বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) বুধবারের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের বিমানবন্দরকেন্দ্রিক পরিস্থিতির কারণে সরাসরি ও ট্রানজিট মিলিয়ে মোট ৮৬টি ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত হয়েছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন ১৩ হাজার ৪৯০ জন যাত্রী।
বেবিচকের হিসাবে, ব্যাহত হওয়া ফ্লাইটের মধ্যে সৌদি আরবের সঙ্গে সরাসরি চলাচলকারী ৩৬টি এবং ট্রানজিট ফ্লাইট ৫০টি।
সরাসরি চলাচলকারী ফ্লাইটের মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ১৪টি, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের ১০টি, রিয়াদ এয়ারওয়েজের সাতটি এবং সৌদিয়া এয়ারলাইন্সের পাঁচটি ফ্লাইট রয়েছে।
ট্রানজিট ফ্লাইটের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে ইন্ডিগো এয়ারলাইন্সের ওপর। সংস্থাটির ২২টি ফ্লাইট চলাচল ব্যাহত হয়েছে। এ ছাড়া এমিরেটস এয়ারলাইন্সের ১১টি, কাতার এয়ারওয়েজের ছয়টি, ফ্লাই দুবাইয়ের ছয়টি, সালাম এয়ারের চারটি এবং ইজিপ্ট এয়ারের একটি ফ্লাইট ব্যাহত হয়েছে।
অর্থাৎ, সংকটের প্রভাব শুধু ঢাকা থেকে সৌদি আরবের সরাসরি ফ্লাইটে সীমাবদ্ধ নেই। বিভিন্ন দেশের বিমানবন্দর হয়ে সৌদি আরবে যাতায়াতকারী যাত্রীরাও এর শিকার হয়েছেন।
যাত্রীদের ভরসা এখন এয়ারলাইন্সের সিদ্ধান্ত
ফ্লাইট বাতিলের কারণে যাত্রীরা কখন সৌদি আরবে ফিরতে পারবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। কেউ টিকিট পরিবর্তনের চেষ্টা করছেন, কেউ সংশ্লিষ্ট কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন, আবার কেউ বিকল্প রুটে যাওয়ার সম্ভাবনা খুঁজছেন।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এ ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় ছিল না। যাত্রীরা যাতে বিমানবন্দরে এসে ভোগান্তিতে না পড়েন, সে জন্য আগেই ফ্লাইট বাতিলের নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের মুখপাত্র কামরুল ইসলামও ফ্লাইট বাতিলের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে তারাও ফ্লাইট বাতিল করেছেন এবং বিষয়টি আগেই জানানো হয়েছে।
তবে ফ্লাইটের নতুন সময়সূচি, ভিসার মেয়াদ শেষ হতে যাওয়া যাত্রীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা কিংবা ছুটি শেষ হওয়া কর্মীদের সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী উদ্যোগ নেবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
ফলে যুদ্ধের ঝুঁকি একদিকে, অন্যদিকে কর্মস্থলে ফিরতে না পারার আর্থিক ও পেশাগত চাপের মধ্যে পড়ে গেছেন ছুটিতে দেশে আসা প্রবাসীরা। তাদের অনেকের কাছে সৌদি আরবে ফিরে যাওয়া এখন আর শুধু যাত্রা নয়; পরিবারের খরচ চালানো, চাকরি ধরে রাখা এবং বিদেশে যাওয়ার পেছনে করা বিনিয়োগ বাঁচানোর প্রশ্নও।








