মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

সবশেষ

ইতালির অস্থিরতায় প্রবাসীদের জীবিকা নিয়ে শঙ্কা, রেমিট্যান্সেও পড়তে পারে প্রভাব

জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয়, আবাসনসংকট ও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা ঘিরে ইতালিতে বাড়ছে জনঅসন্তোষ। তরুণদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া বিক্ষোভে এখন যুক্ত হচ্ছেন বিভিন্ন পেশার মানুষ। পরিস্থিতি সামাল দিতে নিরাপত্তা জোরদার করছে সরকার। তবে এই অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশটিতে বসবাসরত প্রায় আড়াই লাখ বাংলাদেশির কর্মজীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও দেশে অর্থ পাঠানোর সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।

ইতালির বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভের বিস্তার এখন আর শুধু তরুণদের ক্ষোভের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কোথাও যুদ্ধ ও সামরিক ব্যয়ের প্রতিবাদ, কোথাও কম মজুরি, বাড়িভাড়া, শিক্ষাব্যবস্থা ও জনসেবার মান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করছেন বিক্ষোভকারীরা। মিলানসহ গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। সংঘর্ষ ও লুটপাটের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে মিলানে অতিরিক্ত ৫০০ সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্তও নিয়েছে সরকার।

এই পরিস্থিতিতে ইতালিতে কর্মরত বাংলাদেশিদের জন্য বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা তাদের দৈনন্দিন আয়-রোজগারে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ, প্রবাসীদের বড় একটি অংশ নির্মাণ, কৃষি, পরিবহন, রেস্তোরাঁ ও বিভিন্ন সেবামূলক পেশায় কাজ করেন। কেউ কেউ পরিচালনা করেন ছোট দোকান কিংবা নিজস্ব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান।

তবে এখন পর্যন্ত বিক্ষোভের কারণে বাংলাদেশি কর্মীদের আয় কমে যাওয়া, তাদের ওপর সরাসরি হামলা কিংবা দেশে পাঠানো রেমিট্যান্সে নির্দিষ্ট পরিমাণ ক্ষতির কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। আশঙ্কার বিষয়টি মূলত পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে।

ব্যয় বাড়ছে, আয় নিয়ে চাপে সাধারণ মানুষ
ইতালিতে সাম্প্রতিক বিক্ষোভের পেছনে রয়েছে জীবনযাত্রার ব্যয় ও আয়ের মধ্যে বাড়তে থাকা ব্যবধান। জ্বালানি, খাদ্যপণ্য ও বাসাভাড়ার খরচ বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। বিশেষ করে তরুণ ও স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য বড় শহরগুলোতে বাসা ভাড়া নেওয়া, নিয়মিত ব্যয় মেটানো এবং স্থায়ী চাকরি পাওয়া বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলে ১৮ অক্টোবরের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, মূল্যবৃদ্ধি, কম মজুরি ও সাশ্রয়ী আবাসনের সংকটকে কেন্দ্র করে ইতালির বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। মিলানসহ কয়েকটি শহরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে বহু মানুষ আহত হন।

অর্থনৈতিক চাপের প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাতেও। অক্টোবরের তৃতীয় সপ্তাহে ইতালির দক্ষিণাঞ্চলে ট্রাকচালকদের প্রতিবাদে সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হয়। পণ্য পরিবহনে বিঘ্ন ঘটায় কিছু দোকানে তাজা খাবার সরবরাহেও সমস্যা দেখা দেয়। কৃষকেরাও তাদের উদ্বেগ নিয়ে আন্দোলনে যুক্ত হন।

এর ফলে সংকটটি শুধু ভোক্তাদের বাড়তি খরচের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। উৎপাদক, পরিবহনশ্রমিক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ কর্মজীবী, বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের ওপর অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হচ্ছে।

তরুণদের ক্ষোভের কেন্দ্রে ভবিষ্যৎ
ইতালির সাম্প্রতিক বিক্ষোভে তরুণদের অংশগ্রহণ বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তাদের অনেকের উদ্বেগ বর্তমানের খরচের পাশাপাশি ভবিষ্যতে ভালো চাকরি, সাশ্রয়ী আবাসন ও নিরাপদ জীবন পাওয়ার সুযোগ নিয়ে।

২০ অক্টোবর প্রকাশিত দ্য লোকালের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বিক্ষোভে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, পেনশনভোগী, কৃষক ও ট্রাকচালকেরা অংশ নিয়েছেন। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন, স্থবির মজুরির সমস্যার সমাধান এবং জ্বালানির বাড়তি খরচ নিয়ন্ত্রণ।

শিক্ষা খাতেও অসন্তোষ দেখা গেছে। ১৬ অক্টোবর ইতালির বিভিন্ন শহরে শিক্ষার্থীরা সরকারি শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়ানো এবং বিদেশি বংশোদ্ভূত শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি সীমিত করার একটি সরকারি সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবিতে বিক্ষোভ করেন।

তবে আন্দোলনকারীদের সবার দাবি এক নয়। একাংশ জীবনযাত্রার ব্যয় ও কর্মসংস্থান নিয়ে ক্ষুব্ধ, অন্যরা শিক্ষা ও আবাসনের সুযোগ বাড়ানোর দাবি জানাচ্ছেন। আবার কেউ কেউ যুদ্ধবিরোধী অবস্থান থেকে সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির সমালোচনা করছেন। বিভিন্ন ইস্যুর এই সমাবেশ বিক্ষোভকে আরও বিস্তৃত রূপ দিয়েছে।

কঠোর হচ্ছে সরকারের নিরাপত্তাব্যবস্থা
বিক্ষোভ মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী জর্জা মেলোনির সরকার নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করছে। ২১ অক্টোবর আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, মিলানে অতিরিক্ত ৫০০ সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সহিংস বিক্ষোভ মোকাবিলায় কঠোর বিধানসহ নতুন নিরাপত্তাব্যবস্থা অনুমোদন করেছে সরকার।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সহিংস বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার জন্য পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং ২০ হাজার ইউরো পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

সরকারের অবস্থান হলো, নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ভাঙচুর ও লুটপাট ঠেকানো জরুরি। অন্যদিকে, আন্দোলনকারীদের একটি অংশ মনে করছে, শুধু নিরাপত্তাব্যবস্থা কঠোর করে তাদের অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান হবে না।

জীবনযাত্রার ব্যয়, মজুরি, কর্মসংস্থান ও আবাসন নিয়ে অসন্তোষ অব্যাহত থাকলে নতুন করে বিক্ষোভের আশঙ্কাও থেকে যাচ্ছে। ফলে সরকারের সামনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সমস্যাগুলোর মোকাবিলা করার চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

প্রায় আড়াই লাখ বাংলাদেশির জীবিকার প্রশ্ন
ইতালিতে বাংলাদেশের প্রবাসী জনগোষ্ঠী উল্লেখযোগ্য। দেশটিতে বাংলাদেশিদের বসবাস ও কর্মসংস্থানের গুরুত্বের কারণে সেখানকার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্যও প্রাসঙ্গিক।

ইতালির রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলেসান্দ্রো গত ১৬ সেপ্টেম্বর গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, দেশটিতে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার বাংলাদেশি বসবাস করেন।

এই প্রবাসীদের অনেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। আবার কেউ নির্মাণকাজ, কৃষি, পরিবহন, রেস্তোরাঁ কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তাদের আয়ের ওপর বাংলাদেশে থাকা পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয়, শিক্ষা, চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজনও নির্ভর করতে পারে।

বিক্ষোভের কারণে যদি কোনো এলাকায় দীর্ঘ সময় যান চলাচল ব্যাহত হয়, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখতে হয় কিংবা কর্মক্ষেত্রের কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়ে, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের কাজের সময় ও আয় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে এই প্রভাব সব পেশা বা সব শহরে একই রকম হবে, এমনটি ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।

রেমিট্যান্সে প্রভাব পড়বে কি
ইতালিতে অর্থনৈতিক কার্যক্রম দীর্ঘ সময় ব্যাহত হলে প্রবাসীদের আয় এবং তাদের দেশে অর্থ পাঠানোর সক্ষমতার ওপর পরোক্ষ প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে যাদের আয় দৈনিক কাজ, কর্মঘণ্টা কিংবা ছোট ব্যবসার বিক্রির ওপর নির্ভরশীল, তাদের ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান ব্যাহত হওয়া আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে।

তবে ইতালিতে বিক্ষোভ চলছে বলেই বাংলাদেশে রেমিট্যান্স কমে যাবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য নেই। প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে অস্থিরতা কত দিন স্থায়ী হয়, কোন কোন খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং কর্মসংস্থান ও ব্যবসা-বাণিজ্য কতটা স্বাভাবিক থাকে তার ওপর।

বর্তমানে ইতালির বিক্ষোভের কারণে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগ বন্ধ হয়েছে কিংবা বাংলাদেশিদের কাজের ভিসা স্থগিত করা হয়েছে, এমন কোনো সিদ্ধান্তের তথ্যও পাওয়া যায়নি। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা দীর্ঘস্থায়ী হলে কোনো কোনো নিয়োগদাতা নতুন কর্মী নেওয়ার বিষয়ে সতর্ক হতে পারেন, তবে সেটি এখন পর্যন্ত সম্ভাবনার বিষয়, নিশ্চিত পরিস্থিতি নয়।

চলাচল ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় বাড়তি সতর্কতা
বিক্ষোভের সময় সড়ক বন্ধ, গণপরিবহন ব্যাহত কিংবা নির্দিষ্ট এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হলে কর্মস্থলে যাতায়াত ও দৈনন্দিন কাজকর্মে সমস্যা হতে পারে। জরুরি প্রয়োজনে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যাওয়ার ক্ষেত্রেও বাড়তি সময় লাগতে পারে।

ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্যও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। বিক্ষোভের কারণে ক্রেতাদের উপস্থিতি কমে গেলে, দোকান বন্ধ রাখতে হলে কিংবা পণ্য সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হলে বিক্রি ও আয় কমার ঝুঁকি থাকে। ট্রাকচালকদের প্রতিবাদে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হওয়ার ঘটনা এ ধরনের সমস্যার একটি উদাহরণ।

তবে ইতালিতে বাংলাদেশি মালিকানাধীন দোকান বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সরাসরি হামলার শিকার হয়েছে কিংবা বাংলাদেশি নাগরিকেরা বিক্ষোভে আহত হয়েছেন, এমন নির্ভরযোগ্য তথ্য এখানে উল্লেখিত সূত্রগুলো থেকে নিশ্চিত করা যায়নি।

সামনে কোন দিকে যাবে পরিস্থিতি
ইতালির সাম্প্রতিক অস্থিরতার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে সরকার কীভাবে মানুষের অর্থনৈতিক দাবির জবাব দেয় তার ওপর। জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, মজুরি ও কর্মসংস্থানের উন্নতি, সাশ্রয়ী আবাসন এবং সরকারি সেবায় দৃশ্যমান অগ্রগতি এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

অন্যদিকে, কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার হলেও মানুষের দৈনন্দিন সমস্যাগুলোর সমাধান না হলে বিক্ষোভ অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্যও পরিস্থিতির গতিপ্রকৃতি গুরুত্বপূর্ণ। অস্থিরতা সীমিত সময়ের মধ্যে নিয়ন্ত্রণে এলে কর্মজীবন ও ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব না-ও পড়তে পারে। কিন্তু বিক্ষোভ দীর্ঘস্থায়ী হয়ে পরিবহন, কর্মসংস্থান ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমে বিঘ্ন সৃষ্টি করলে তার চাপ প্রবাসীদের আয় এবং দেশে থাকা পরিবারের আর্থিক অবস্থার ওপরও পড়তে পারে।

তাই ইতালির পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি বাস্তব তথ্যের ভিত্তিতে প্রভাব মূল্যায়ন করাও জরুরি। আপাতত প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য মূল প্রশ্ন হলো, দেশটির চলমান অস্থিরতা কত দ্রুত স্বাভাবিক হয় এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তাদের দৈনন্দিন জীবনে কতটা প্রভাব ফেলে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *