বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের নানা সমস্যা, প্রতারণা ও হয়রানির অভিযোগ সরাসরি গ্রহণ এবং দ্রুত সমাধানের লক্ষ্যে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় চালু করেছে ‘অভিযোগ নিষ্পত্তি ও নিরসন সেল’, যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিরা সরাসরি তাদের অভিযোগ জানাতে পারবেন।
সরকারের দাবি, এই উদ্যোগের মাধ্যমে আগামী ছয় মাসের মধ্যে প্রবাসী সেবায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আনার চেষ্টা করা হবে।
প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী খন্দকার আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, বিদেশে থাকা বাংলাদেশিরা এখন ই-মেইলের মাধ্যমে সরাসরি মন্ত্রণালয়ের কাছে তাদের সমস্যার কথা জানাতে পারবেন। অভিযোগগুলো দৈনিক ও সাপ্তাহিক ভিত্তিতে পর্যালোচনা করা হবে এবং দ্রুত সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এ উদ্দেশ্যে দুটি ই-মেইল ঠিকানা চালু করা হয়েছে, minister@probashi.gov.bd এবং minister.expat@gmail.com।
তবে নতুন অভিযোগ সেল চালুর ঘোষণার পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে সরকারের অবস্থান। প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী জানিয়েছেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়ে কাজ চলছে এবং এবার কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে কোনো ধরনের সিন্ডিকেটের সুযোগ রাখা হবে না।
মালয়েশিয়া দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার। কিন্তু এই বাজারকে ঘিরে বছরের পর বছর ধরে নানা অভিযোগ উঠে এসেছে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতা, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় এবং সীমিতসংখ্যক রিক্রুটিং এজেন্সির প্রভাব নিয়ে সমালোচনা ছিল ব্যাপক।
বিশেষ করে ২০২২ সালে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর পর তথাকথিত ‘২৫ এজেন্সি সিন্ডিকেট’ নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়। অভিযোগ ছিল, কর্মী পাঠানোর সুযোগ অল্প কয়েকটি এজেন্সির হাতে সীমাবদ্ধ থাকায় প্রতিযোগিতা কমে যায় এবং বিদেশগামী কর্মীদের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়।
অনেক কর্মী জানিয়েছেন, মালয়েশিয়ায় যেতে তাদের ৭ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হয়েছে। কেউ জমি বিক্রি করেছেন, কেউ উচ্চ সুদে ঋণ নিয়েছেন, আবার অনেকেই বিদেশে গিয়ে প্রত্যাশিত কর্মসংস্থান পাননি।
এ কারণেই মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে নতুন কোনো ঘোষণা এলেই তা হাজারো কর্মী ও তাদের পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ একটি চাকরির সুযোগের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পুরো পরিবারের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ।
এদিকে সম্প্রতি রাশিয়ায় প্রতারণার মাধ্যমে কর্মী পাঠানোর অভিযোগে তিনটি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল এবং তাদের জামানত বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, অনিয়মের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থানের এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, শুধু অভিযোগ গ্রহণের জন্য একটি সেল চালু করাই যথেষ্ট নয়। প্রবাসী কর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ করা, দালালচক্রের প্রভাব কমানো এবং বিদেশগামী কর্মীদের ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার মতো কার্যকর পদক্ষেপও প্রয়োজন।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই তাদের স্বার্থ সুরক্ষায় সরকারের নতুন উদ্যোগ ইতিবাচক হিসেবে দেখা হলেও, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার সত্যিই কতটা সিন্ডিকেটমুক্ত হয় এবং কর্মীদের ব্যয় কতটা কমে, সেদিকেই এখন সবার নজর।








