ইরানের জব্দ থাকা বিপুল পরিমাণ বিদেশি সম্পদ মুক্তির প্রশ্নে কঠোর অবস্থান নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, তেহরানের সঙ্গে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত শত শত কোটি ডলারের জব্দ অর্থ অবমুক্ত করার কোনো পরিকল্পনা নেই।
রোববার সম্প্রচারিত এনবিসি নিউজের ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে সমঝোতা চূড়ান্ত হওয়ার আগে অর্থ ছাড়ের বিষয়টি বিবেচনাই করা হবে না। তাঁর ভাষায়, “তারা যদি দায়িত্বশীল আচরণ করে এবং ইতিবাচক পদক্ষেপ নেয়, তাহলে আমরা আলোচনায় এগোতে পারি।”
ট্রাম্পের এই মন্তব্য এমন সময়ে এসেছে, যখন তেহরান বারবার ইঙ্গিত দিচ্ছে যে জব্দ থাকা সম্পদের অন্তত একটি অংশ মুক্ত না হলে কোনো চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানো কঠিন হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি দীর্ঘদিনের অবিশ্বাসের কারণেই তারা এ শর্ত সামনে এনেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কূটনৈতিক আলোচনার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র দুই দফা সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছিল। বিশ্লেষকদের মতে, এই অভিজ্ঞতার কারণে বর্তমান যুদ্ধবিরতি আলোচনায় ইরানি নেতৃত্ব অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করেছে।
যদিও কয়েক সপ্তাহ ধরে ট্রাম্প প্রশাসন সম্ভাব্য সমঝোতার বিষয়ে আশাবাদী বক্তব্য দিয়ে আসছে, তবু হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ, পারমাণবিক কার্যক্রম এবং জব্দ সম্পদের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত এখনো পাওয়া যায়নি।
উইসকনসিন সফরের সময় ধারণ করা আরেক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, “আমরা হয় একটি চুক্তির খুব কাছাকাছি, নয়তো ভয়াবহ সামরিক পদক্ষেপের মুখোমুখি হব।” তাঁর এই বক্তব্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পাশাপাশি সামরিক চাপ অব্যাহত রাখার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির সামরিক উপদেষ্টা মোহসেন রেজায়ী শনিবার সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, আলোচনায় কার্যত অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
১০০ বিলিয়নের বেশি ডলার নিয়ে টানাপোড়েন
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে বিশ্বের নানা ব্যাংকে ইরানের ১০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি সম্পদ আটকে রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির আওতায় এসব সম্পদ ধীরে ধীরে ব্যবহারের সুযোগ পাওয়ার কথা থাকলেও ২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রশাসন চুক্তি থেকে সরে গেলে সেই প্রক্রিয়া থেমে যায়।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্যমতে, চলমান যুদ্ধবিরতি আলোচনায় তেহরান ১২ থেকে ২৪ বিলিয়ন ডলার অবমুক্ত করার দাবি জানিয়েছে। তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী, চুক্তি স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গে অর্ধেক অর্থ ছাড় করতে হবে এবং বাকি অংশ পরবর্তী ধাপে দেওয়া হবে।
মোহসেন রেজায়ী এই অর্থছাড়কে দুই দেশের মধ্যে আস্থা পুনর্গঠনের অন্যতম পরীক্ষাস্বরূপ বলে মন্তব্য করেছেন।
খামেনিকে নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্য
এনবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প জানান, তিনি মোজতবা খামেনির সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে প্রস্তুত। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর নেতৃত্বে আসা খামেনিকে ঘিরেও মন্তব্য করেন তিনি।
ট্রাম্প বলেন, খামেনির অবস্থান সম্পর্কে তাঁর ধারণা থাকতে পারে, তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত প্রকাশ করতে চান না। সংঘাতের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় আহত হওয়ার পর থেকে খামেনিকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি।
লেবানন ইস্যুতেও উত্তেজনা
যুদ্ধবিরতি আলোচনার পাশাপাশি লেবানন প্রশ্নেও উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। ট্রাম্প জানিয়েছেন, সম্ভাব্য চুক্তির অংশ হিসেবে লেবাননকে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি তিনি করছেন না।
তবে লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযান আলোচনার পরিবেশকে জটিল করে তুলছে। ইরান এ হামলার বিরোধিতা করছে।
এদিকে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সতর্ক করে বলেছেন, দক্ষিণ বৈরুতে ইসরায়েলি হামলা এবং ইরানি বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ অব্যাহত থাকলে তেহরান পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পারে।
অপরদিকে, আল-জাজিরাকে দেওয়া এক মার্কিন কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, লেবাননের বর্তমান সংঘাতের জন্য ওয়াশিংটন সম্পূর্ণভাবে হিজবুল্লাহকেই দায়ী করছে।








