বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬

সবশেষ

বাজেট কী, এর অর্থ আসে কীভাবে, কোথা থেকে?

আমরা সবাই কোনো না কোনোভাবে বাজেট করি। মাসের শুরুতে হিসাব করি, বাড়িভাড়া, বাজার, বিদ্যুৎ বিল, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা, যাতায়াত এবং কিছু সঞ্চয়। কিন্তু মাস শেষে প্রায়ই দেখা যায় হিসাবের সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই।

রাষ্ট্রও একই কাজ করে। পার্থক্য শুধু এতটুকু যে একটি পরিবারের সদস্য চার-পাঁচজন, আর রাষ্ট্রের পরিবারের সদস্য কোটি কোটি মানুষ। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর আয়-ব্যয়ের বার্ষিক পরিকল্পনার নামই জাতীয় বাজেট।

অনেকের কাছে বাজেট মানে অর্থমন্ত্রী, আমলা কিংবা অর্থনীতিবিদদের জটিল হিসাব। বাস্তবে বাজেট তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু। আপনি যে মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন, ইন্টারনেট চালান, বাজার থেকে চাল-ডাল কেনেন, বাসে চড়েন বা চিকিৎসা নেন তার সবকিছুর সঙ্গেই বাজেটের সম্পর্ক রয়েছে। তাই বাজেট মূলত মানুষের জীবনযাত্রার গল্প।

বাজেট কী?
বাজেট হলো নির্দিষ্ট সময়ের জন্য আয় ও ব্যয়ের পরিকল্পনা। সাধারণত এক বছরের জন্য এই পরিকল্পনা করা হয়। ব্যক্তি, পরিবার, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কিংবা সরকার, সবারই বাজেট থাকতে পারে।

সরকারি বাজেটে মূলত দুটি প্রশ্নের উত্তর থাকে। প্রথমত, সরকার কোথা থেকে কত টাকা আয় করবে। দ্বিতীয়ত, সেই টাকা কোন খাতে কত ব্যয় করবে। অর্থাৎ বাজেট কেবল হিসাবের খাতা নয়; এটি সরকারের অগ্রাধিকার, উন্নয়ন-দর্শন এবং অর্থনৈতিক কৌশলের প্রতিফলন। তাই বলাই যায়, বাজেট শুধু সংখ্যার খাতা নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার আয়না।

‘বাজেট’ শব্দের অর্থ আসে কীভাবে?
আমরা বাজেট বলতে আয়ের ও ব্যয়ের পরিকল্পনাকে বুঝি। কিন্তু শব্দটির মূল অর্থ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ‘বাজেট’ শব্দটি এসেছে ইংরেজি Budget থেকে। আর ইংরেজি Budget এসেছে পুরোনো ফরাসি শব্দ Bougette থেকে। এর অর্থ ছিল একটি ছোট চামড়ার থলে বা ব্যাগ।

অতীতে অর্থমন্ত্রী তার আর্থিক নথিপত্র ও প্রস্তাব একটি চামড়ার ব্যাগে করে সংসদে নিয়ে আসতেন। ধীরে ধীরে সেই ব্যাগের নামই আর্থিক পরিকল্পনার প্রতীক হয়ে ওঠে। পরে Budget শব্দটি রাষ্ট্রের আয়-ব্যয়ের আনুষ্ঠানিক পরিকল্পনা বোঝাতে ব্যবহৃত হতে শুরু করে। অর্থাৎ আজ যে শব্দটি আমরা অর্থনৈতিক পরিকল্পনা হিসেবে ব্যবহার করি, তার জন্ম হয়েছিল একটি সাধারণ চামড়ার ব্যাগ থেকে।

বাজেটের ধারণা কোথা থেকে এলো?
আধুনিক বাজেট ব্যবস্থার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ব্রিটিশ সংসদীয় শাসনব্যবস্থা। ১৭৩৩ সালে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী রবার্ট ওয়ালপুল বিভিন্ন করসংক্রান্ত প্রস্তাব একটি চামড়ার ব্যাগে করে সংসদে নিয়ে আসেন এবং সেখান থেকে কাগজ বের করে আর্থিক পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন। এটিকেই আধুনিক বাজেট ব্যবস্থার সূচনা হিসেবে ধরা হয়।

তবে বাজেটের প্রকৃত রাজনৈতিক ভিত্তি আরও পুরোনো। ১২১৫ সালে ইংল্যান্ডে ম্যাগনা কার্টা নামে একটি ঐতিহাসিক সনদ স্বাক্ষরিত হয়। সেখানে প্রথমবারের মতো বলা হয়, জনগণের প্রতিনিধিদের সম্মতি ছাড়া কোনো কর আরোপ করা যাবে না। এই ধারণাই পরবর্তীতে একটি বিখ্যাত রাজনৈতিক নীতিতে রূপ নেয়, No Taxation Without Representation। অর্থাৎ প্রতিনিধিত্ব ছাড়া কর নয়।

এই নীতির মূল বক্তব্য হলো, জনগণ কর দেবে ঠিকই, কিন্তু সেই কর আরোপের ক্ষমতা জনগণের প্রতিনিধিদের অনুমোদনের ভিত্তিতেই হতে হবে। আজকের গণতান্ত্রিক বাজেট ব্যবস্থার ভিত্তি এই দর্শনের ওপরই দাঁড়িয়ে আছে।

উপমহাদেশে বাজেটের যাত্রা
উপমহাদেশের প্রথম বাজেট পেশ করা হয় ১৮৬০ সালের ৭ এপ্রিল। এটি উপস্থাপন করেন জেমস উইলসন, যিনি পরবর্তীকালে বিখ্যাত অর্থনৈতিক সাময়িকী The Economist-এর প্রতিষ্ঠাতা হিসেবেও পরিচিত হন।

ব্রিটিশ ভারতের শেষ বাজেট পেশ করেন লিয়াকত আলী খান ১৯৪৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি। ইতিহাসে এটি ‘পুওর ম্যানস বাজেট’ নামে পরিচিত। কারণ, সে বাজেটে গরিব মানুষের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ কর-সুবিধা দেওয়া হয়েছিল।

পাকিস্তান আমলে প্রথম বাজেট দেন মালিক গুলাম মোহাম্মদ। সেই সময় থেকেই জুলাই-জুন অর্থবছরের প্রচলন শুরু হয়, যা বাংলাদেশ এখনো অনুসরণ করছে।

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বাজেট উপস্থাপন করেন দেশের প্রথম অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। ১৯৭২ সালের ৩০ জুন তিনি বেতার ও টেলিভিশনের মাধ্যমে বাজেট ঘোষণা করেন।

বাজেট কেন সংসদে উপস্থাপন করা হয়?
বাজেট সংসদে উপস্থাপন করার কারণ, জনগণের করের অর্থ কীভাবে ব্যয় হবে, সে সিদ্ধান্ত এককভাবে সরকার নিতে পারে না। বাংলাদেশের সংবিধানের ৮৩ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সংসদের অনুমোদন ছাড়া কোনো কর আরোপ বা আদায় করা যাবে না।

আবার ৮৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রতি অর্থবছরে সরকারকে সংসদের সামনে সম্ভাব্য আয় ও ব্যয়ের বিবরণ উপস্থাপন করতে হয়। অর্থাৎ বাজেট শুধু অর্থনৈতিক দলিল নয়, এটি গণতান্ত্রিক জবাবদিহিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

সরকারের টাকা কোথা থেকে আসে?
অনেকে মনে করেন সরকারের নিজস্ব অর্থ আছে। বাস্তবে সরকারের প্রধান আয়ের উৎস জনগণই। সরকার মূলত তিন ধরনের উৎস থেকে আয় করে। তার মধ্যে সবার প্রথমেই আসে, প্রত্যক্ষ কর। অর্থাৎ যে কর সরাসরি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ওপর আরোপ করা হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আয়কর, করপোরেট কর, ভূমি রাজস্ব এবং যানবাহন কর।

সরকারের দ্বিতীয় আয়ের উৎস, পরোক্ষ কর। অর্থাৎ যে কর পণ্য বা সেবা ব্যবহারের সময় পরিশোধ করতে হয়। আরেকটু সহজ করে বললে, কেনা পণ্যের ভ্যাট, আমদানি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক এবং আবগারি শুল্ককেই পরোক্ষ কর হিসেবে ধরা হয়।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আপনি যখন মোবাইল রিচার্জ করেন, রেস্টুরেন্টে খেতে যান বা বাজার থেকে কোনো পণ্য কিনেন, তখনও নানা ধরনের কর পরিশোধ করেন।

সরকারের আয়ের তৃতীয় উৎস, করবহির্ভূত আয়। অর্থাৎ, কর ছাড়াও সরকারের কিছু আয় রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সরকারি প্রতিষ্ঠানের মুনাফা টোল, জরিমানা, ভাড়া ও ইজারা, সুদ আয়।

সরকার এই টাকা কোথায় ব্যয় করে?
সরকারের ব্যয় সাধারণত দুই ভাগে বিভক্ত। তার মধ্যে একটি রাজস্ব ব্যয়। এটি রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যয়। যেমন: সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, প্রশাসনিক ব্যয়, প্রতিরক্ষা, আইনশৃঙ্খলা, ঋণের সুদ পরিশোধ এবং উন্নয়ন ব্যয়।

এই ব্যয়ের লক্ষ্য ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। উদাহরণ হিসেবে, রাস্তা ও সেতু নির্মাণ, বিদ্যুৎকেন্দ্র, স্কুল ও কলেজ, হাসপাতাল এবং প্রযুক্তি ও অবকাঠামো নির্মাণ। অর্থাৎ, একটি পরিবার যেমন সন্তানের শিক্ষায় বিনিয়োগ করে ভবিষ্যৎ উন্নতির আশা করে, রাষ্ট্রও উন্নয়ন ব্যয়ের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে চায়।

বাজেট ঘাটতি কী?
সরকারের ব্যয় যখন আয়ের চেয়ে বেশি হয়, তখন তাকে বাজেট ঘাটতি বলা হয়। ধরুন, সরকারের আয় ১০০ টাকা, কিন্তু ব্যয়ের পরিকল্পনা ১৩০ টাকা। তখন ৩০ টাকার ঘাটতি তৈরি হবে। বাংলাদেশসহ অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশে এই ঘাটতি নিয়মিত দেখা যায়।

ঘাটতির টাকা কোথা থেকে আসে?
ঘাটতি পূরণে সরকার মূলত ঋণ নেয়। বিশেষ করে, বৈদেশিক ঋণ। অর্থাৎ, বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা ও বিদেশি সরকার থেকে নেওয়া ঋণ। সাধারণত সুদ কম এবং পরিশোধের সময় বেশি হলেও নানা শর্ত থাকে।

একটি দেশের সরকার ব্যয় ঘাটতি মেটাতে শুধু বৈদেশিক ঋণের উপর নির্ভরশীল থাকে না। দেশের অভ্যন্তরীণ ঋণও গ্রহণ করে থাকে। অর্থাৎ, দেশের ভেতর থেকে নেওয়া ঋণ। যেমন: ট্রেজারি বিল, সরকারি বন্ড এবং সঞ্চয়পত্র। এই অর্থ মূলত জনগণ এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকেই আসে।

সরকার কি চাইলেই টাকা ছাপাতে পারে?
তাত্ত্বিকভাবে পারে। সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে নতুন অর্থ সৃষ্টি করে বাজেট ঘাটতি পূরণ করতে পারে। একে সাধারণ ভাষায় টাকা ছাপানো বলা হয়। কিন্তু এখানে বড় সমস্যা রয়েছে।

টাকা ছাপালে অর্থের পরিমাণ বাড়ে, কিন্তু চাল, তেল, বিদ্যুৎ, বাসস্থান বা চাকরি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়ে না। ফলে একই পণ্যের পেছনে বেশি টাকা ছুটতে থাকে এবং মূল্যস্ফীতি বাড়ে। তাই অর্থনীতির প্রকৃত ভিত্তি টাকা ছাপানো নয়; উৎপাদন, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ এবং মানুষের আস্থা।

কোন বাজেট ভালো?
এ প্রশ্নের সহজ উত্তর নেই। তবে সুষম বাজেটকে ভালো বাজেট হিসেবে ধরা যেতে পারে। যেখানে আয় ও ব্যয় সমান।

উদ্বৃত্ত বাজেট
যেখানে আয় ব্যয়ের চেয়ে বেশি। অর্থাৎ, যে বাজেটে সরকারের আয় ব্যয়ের চেয়ে বেশি থাকে, তাকে উদ্বৃত্ত বাজেট বলা হয়। এটি সাধারণত অর্থনীতি শক্তিশালী থাকলে বা ঋণ কমানোর প্রয়োজন হলে গ্রহণ করা হয়।

ঘাটতি বাজেট
যেখানে ব্যয় আয়ের চেয়ে বেশি। একসময় ঘাটতি বাজেটকে নেতিবাচক হিসেবে দেখা হতো। বর্তমানে অর্থনীতিবিদেরা মনে করেন, উন্নয়নশীল দেশের জন্য সীমিত ঘাটতি গ্রহণযোগ্য এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়ও। কারণ, এটি অবকাঠামো নির্মাণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে উৎসাহিত করতে পারে। তবে ঘাটতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে ঋণের বোঝা বাড়ে এবং অর্থনীতি ঝুঁকির মুখে পড়ে।

বাজেটের মাধ্যমে সরকার আসলে কী করতে চায়?
বাজেটের উদ্দেশ্য শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব রাখা নয়। একটি কার্যকর বাজেটের মাধ্যমে সরকার, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে চায়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে চায়, দারিদ্র্য কমাতে চায়, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে চায়, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন ঘটাতে চায়। অর্থাৎ বাজেট হচ্ছে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক দর্শনের বাস্তব রূপ।

একজন সাধারণ নাগরিক বাজেটে কী দেখবেন?
বাজেট বিশ্লেষণের সময় সাধারণ মানুষের কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ নজর দেওয়া উচিত। তার মধ্যে, দ্রব্যমূল্যের ওপর প্রভাব, করের বোঝা বাড়ছে না কমছে, নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তব উপযোগিতা এবং সরকারের ঋণের পরিমাণ ও উৎস।

দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য বাজেট কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বাজেটকে অনেকেই কেবল সংখ্যার সমষ্টি মনে করেন। বাস্তবে এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক দর্শন, রাজনৈতিক অগ্রাধিকার এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের রূপরেখা।

আপনি যে কর দেন, তার অর্থ কোথায় ব্যয় হবে, আগামী বছর আপনার জীবনে কোন পণ্য সস্তা হবে বা দাম বাড়বে, নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি হবে কি না, চিকিৎসা ও শিক্ষায় কী পরিবর্তন আসবে, এসব প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে থাকে বাজেটের ভেতর।

তাই বাজেট কেবল অর্থমন্ত্রীর বক্তৃতা নয়; এটি আসলে রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার এক ধরনের সামাজিক চুক্তি। আর সেই চুক্তির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে মানুষের জীবন, স্বপ্ন এবং ভবিষ্যৎ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *