রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬

সবশেষ

রামিসাকে হত্যা কেন, আদালতে সোহেলের ব্যাখ্যা, তবে প্রশ্ন রয়ে গেল অনেক

রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে যে ক্ষোভ ও শোকের সৃষ্টি হয়েছিল, সেই মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানা এবার আদালতের কাছে নিজের অপরাধ স্বীকার করে হত্যাকাণ্ডের পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। তবে তার বক্তব্য নতুন কিছু প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে।

রোববার হাইকোর্টে করা জেল আপিলে সোহেল রানা দাবি করেন, পারিবারিক অশান্তি, মাদকাসক্তি এবং আর্থিক সংকটের কারণে ঘটনাটি ঘটেছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি তখন মাদকের প্রভাবে ছিলেন এবং কীভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে, তা বুঝতে পারেননি।

আদালতে দেওয়া আপিলে সোহেল বলেন, ‘আমি ভুল করেছি। আমি ক্ষমা চাই।’ একই সঙ্গে তিনি নিজের একমাত্র সন্তানের ভবিষ্যৎ এবং পরিবারের দেখভালের বিষয়টিও আদালতের বিবেচনায় নেওয়ার অনুরোধ জানান।

সোহেলের বক্তব্যে কী উঠে এসেছে?
সোহেলের জেল আপিল বিশ্লেষণ করলে তিনটি বিষয় স্পষ্টভাবে সামনে আসে। প্রথমত, তিনি হত্যাকাণ্ডের জন্য পারিবারিক অস্থিরতাকে দায়ী করেছেন।

দ্বিতীয়ত, তিনি নিজের মাদকাসক্তির কথা স্বীকার করেছেন এবং দাবি করেছেন, মাদকের প্রভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিলেন।

তৃতীয়ত, দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকট তার মানসিক অবস্থাকে আরও অস্থির করে তুলেছিল বলে উল্লেখ করেছেন।

তবে আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যক্তিগত সংকট বা মাদকাসক্তি কোনোভাবেই শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মতো অপরাধের আইনি দায় কমিয়ে দেয় না। আদালত সাধারণত এসব বক্তব্যকে সাজা লঘু করার আবেদন হিসেবে বিবেচনা করলেও অপরাধের প্রকৃতি ও ভয়াবহতাই বিচারিক সিদ্ধান্তে বেশি গুরুত্ব পায়।

স্বপ্নার অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন
অন্যদিকে একই মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত স্বপ্না খাতুনের অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি আদালতে দাবি করেছেন, রামিসা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তাকে অন্যায়ভাবে মামলায় জড়ানো হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

অর্থাৎ মামলার দুই আসামির বক্তব্যে স্পষ্ট পার্থক্য দেখা গেছে। একজন অপরাধ স্বীকার করে ক্ষমা চাইছেন, অন্যজন নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ বলে দাবি করছেন।

এখন মামলার অবস্থান কোথায়?
গত ১১ জুন কারা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে হাইকোর্টে জেল আপিল করেন সোহেল রানা ও স্বপ্না খাতুন। রোববার হাইকোর্ট সেই আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করেন।

এর আগে, গত ৭ জুন ঢাকার শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানাকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ধারা ৯(২) অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড এবং ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। একই সঙ্গে স্বপ্না খাতুনকেও মৃত্যুদণ্ড এবং ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়।

রায় ঘোষণার পর দুই আসামিকে কারাগারের কনডেম সেলে পাঠানো হয়।

যে ঘটনা নাড়িয়ে দিয়েছিল পুরো দেশকে
মামলার নথি অনুযায়ী, গত ১৯ মে সকালে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসা আক্তার নিখোঁজ হয়। পরিবারের সদস্যরা খোঁজাখুঁজি শুরু করলে পরে একটি ফ্ল্যাটের ভেতর থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

আট বছর বয়সী শিশুটির মৃত্যু দেশের বিভিন্ন মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে রাজনৈতিক ও নাগরিক সমাজে দ্রুত বিচার এবং সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি ওঠে।

পরে তদন্ত শেষে পুলিশ আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়। ঘটনার পর প্রধান আসামি সোহেল রানা পালিয়ে গেলেও প্রযুক্তিগত সহায়তায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর দ্রুত বিচার কার্যক্রম শেষে ট্রাইব্যুনাল রায় ঘোষণা করেন।

সামনে কী হতে পারে?
হাইকোর্টে জেল আপিল গ্রহণের অর্থ এই নয় যে সাজা বাতিল হয়ে গেছে। বরং এখন উচ্চ আদালত নিম্ন আদালতের রায়, সাক্ষ্যপ্রমাণ, তদন্ত প্রতিবেদন এবং আসামিদের বক্তব্য পর্যালোচনা করবেন।

সোহেলের দাবি অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের পেছনে পারিবারিক অশান্তি, মাদকাসক্তি ও আর্থিক সংকট ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু এসব কারণ আদালতের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য হবে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কারণ বিচারিক দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, একটি শিশুর ওপর সংঘটিত ভয়াবহ অপরাধের প্রমাণ কতটা শক্তিশালী এবং সেই অপরাধে আসামিদের দায় কতটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *