রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬

সবশেষ

এএসপি কার্যালয়ের কাছেই প্রকাশ্যে গুলি করে যুবদল নেতা হত্যা, আতঙ্কে বন্ধ হয়ে যায় বাজার

চট্টগ্রামের রাউজানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যালয় থেকে অল্প দূরত্বে ব্যস্ত বাজারের মধ্যে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে এক যুবদল নেতাকে। হামলার পর অস্ত্রধারীরা ফাঁকা গুলি ছুড়ে এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করে নির্বিঘ্নে চলে যায়। ঘটনাটি ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

শনিবার দুপুর দেড়টার দিকে রাউজান উপজেলার পাহাড়তলী ইউনিয়নের চৌমুহনী বাজারে এ ঘটনা ঘটে। নিহত মাসুদুল হক চৌধুরী (৪৫) রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন।

বাজারের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে পাঁচ থেকে সাতজন অস্ত্রধারী ঘটনাস্থলে আসে। সে সময় মাসুদুল একটি ওষুধের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। অটোরিকশা থেকে নেমেই হামলাকারীরা খুব কাছ থেকে তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি ঘটনাস্থলেই লুটিয়ে পড়েন।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, নিহতের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পরও হামলাকারীরা থামেনি। বরং তারা ফাঁকা গুলি ছুড়তে থাকে এবং আশপাশের লোকজনকে দূরে সরে যেতে হুমকি দেয়। এরপর একই অটোরিকশায় করে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে তারা।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, হামলাকারীদের একজন কালো মুখোশ পরা ছিল। তবে অন্যদের মুখ স্পষ্টভাবে সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়েছে। ফুটেজে তিনজনের হাতে পিস্তল এবং দুজনের হাতে শটগান দেখা গেছে।

ঘটনাস্থলটি রাউজান-রাঙ্গুনিয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে আধা কিলোমিটারেরও কম দূরত্বে। এ কারণে প্রকাশ্য এ হত্যাকাণ্ড এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

পরিবারের সদস্যরা জানান, মাসুদুল হক চৌধুরী রাঙ্গুনিয়ার বেতাগী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মুহাম্মদ পিয়ারুল হক চৌধুরীর ছোট ভাই। তিনি আগামী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার কিছুক্ষণ আগে মাসুদুল রাঙ্গুনিয়ার বেতাগী এলাকা থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে চৌমুহনী বাজারে আসেন। হামলাকারীরাও আরেকটি অটোরিকশায় করে তাকে অনুসরণ করে বাজারে পৌঁছায়। সুযোগ বুঝে তারা গুলি চালায়।

হত্যাকাণ্ডের পর পুরো বাজারে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অধিকাংশ ব্যবসায়ী দ্রুত দোকানপাট বন্ধ করে চলে যান। সন্ধ্যার মধ্যে বাজার প্রায় ফাঁকা হয়ে যায়।

স্থানীয় ব্যবসায়ী আবদুল মাবুদ বলেন, দিনের বেলায় এত বড় গোলাগুলির ঘটনা তিনি আগে দেখেননি। প্রকাশ্যে এমন হত্যাকাণ্ডের পর ব্যবসায়ীদের মধ্যে ভয় কাজ করছে। বাজারে ৩০টির বেশি সিসিটিভি ক্যামেরা থাকা সত্ত্বেও সন্ত্রাসীরা কোনো ধরনের ভয় ছাড়াই হামলা চালিয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

পুলিশ নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়েছে। রোববার ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তরের কথা রয়েছে।

প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ ধারণা করছে, রাজনৈতিক বিরোধ কিংবা বালু ব্যবসা নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে হত্যাকাণ্ডটি ঘটতে পারে। এ ঘটনায় মামলা দায়েরের জন্য নিহতের পরিবারকে থানায় যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।

রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম জানান, হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া তিন থেকে চারজনের পরিচয় ইতিমধ্যে শনাক্ত করা গেছে। তারা সবাই রাউজানের বাসিন্দা। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।

তিনি আরও বলেন, এখন পর্যন্ত হামলাকারীদের কোনো নির্দিষ্ট দলীয় পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তদন্তে জানা গেছে, হত্যার পর তারা কদলপুরের পাহাড়ি পথ ব্যবহার করে এলাকা ছেড়ে যায়।

উল্লেখ্য, রাউজানে এর আগেও একই ধরনের হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। প্রায় দেড় মাস আগে উপজেলার কদলপুর এলাকায় গুলি করে হত্যা করা হয় যুবদলকর্মী মুহাম্মদ নাসিরকে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে রাউজানে ২৫টি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ১৮টির পেছনে রাজনৈতিক বিরোধের বিষয়টি সামনে এসেছে। একই সময়ে শতাধিক সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনায় আহত হয়েছেন সাড়ে তিন শতাধিক মানুষ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *