রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬

সবশেষ

চুক্তি কি সত্যিই দুয়ারে, নাকি এখনো অনিশ্চয়তায়? ভিন্ন বার্তায় বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা নিয়ে ধোঁয়াশা

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত নিরসনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সম্ভাব্য সমঝোতা চুক্তি নিয়ে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে জোর আলোচনা চলছে। তবে চুক্তি স্বাক্ষর এখন সময়ের ব্যাপার, এমন দাবি যেমন শোনা যাচ্ছে ওয়াশিংটন থেকে, তেমনি তেহরান বলছে, এখনও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই হয়নি। ফলে চুক্তি বাস্তবায়নের সম্ভাবনার পাশাপাশি অনিশ্চয়তাও সমানতালে বাড়ছে।

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে, দুই দেশ কি সত্যিই চুক্তির একেবারে কাছাকাছি পৌঁছেছে, নাকি এখনো গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও কৌশলগত বাধা কাটিয়ে উঠতে পারেনি?

ট্রাম্পের আত্মবিশ্বাস, তেহরানের সতর্কতা
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টি খুবই নিকটবর্তী। তার ভাষ্য অনুযায়ী, রোববারই এ সমঝোতা চূড়ান্ত হওয়ার কথা এবং চুক্তি কার্যকর হলে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় সবার জন্য উন্মুক্ত করা হবে।

যদিও এমন আশাবাদী অবস্থানের সঙ্গে একমত নয় ইরান। দেশটির আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম ফার্স নিউজ এজেন্সি আলোচনার সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, তেহরান এখনো প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারক নিয়ে কোনো চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়নি। ইরানি কর্মকর্তাদের বক্তব্যেও একই ধরনের সতর্কতা দেখা যাচ্ছে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই স্পষ্ট করে বলেছেন, চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য কোনো নির্দিষ্ট তারিখ ঠিক হয়নি এবং রোববার এমন কিছু ঘটছে না। তবে তিনি এটাও স্বীকার করেছেন যে, আলোচনাগুলো আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় চূড়ান্ত পর্যায়ের কাছাকাছি পৌঁছেছে।

আপত্তি কোথায়?
চুক্তি ঘিরে ইরানের অভ্যন্তরেও মতভেদ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দেশটির কট্টরপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠী ও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরস-ঘনিষ্ঠ বিভিন্ন মহল আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, সম্ভাব্য সমঝোতা হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কৌশলগত প্রভাব কমিয়ে দিতে পারে। তাদের মতে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমঝোতা করতে গিয়ে তেহরান অতিরিক্ত ছাড় দিয়ে ফেলতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের ভেতরের এই রাজনৈতিক চাপই চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার পথে অন্যতম বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

মধ্যস্থতাকারীদের ভূমিকা
চুক্তিকে এগিয়ে নিতে বিভিন্ন আঞ্চলিক দেশ সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। রোববার কাতারের একটি প্রতিনিধিদল তেহরানে পৌঁছেছে বলে ইরানি গণমাধ্যম জানিয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, এই সফরের লক্ষ্য হচ্ছে আলোচনার বাকি জটিলতাগুলো দূর করা এবং সম্ভাব্য সমঝোতার চূড়ান্ত রূপ দিতে সহায়তা করা।

পাকিস্তানও ইঙ্গিত দিয়েছে, আগামী কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের মধ্যেই উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যেতে পারে।

তবে এসব আশাবাদের বিপরীতে ইরান এখনো সময়সীমা নির্ধারণে অনাগ্রহী। দেশটির কর্মকর্তারা বলছেন, আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এটিকে চূড়ান্ত চুক্তি বলে ঘোষণা করার মতো অবস্থান এখনো তৈরি হয়নি।

কী থাকতে পারে চুক্তিতে?
আলোচনার সঙ্গে সম্পৃক্ত বিভিন্ন সূত্রের দাবি, প্রস্তাবিত সমঝোতায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা, বিদ্যমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার নিয়ে পরবর্তী আলোচনা শুরু করা।

তবে এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষই আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তির পূর্ণাঙ্গ খসড়া প্রকাশ করেনি। ফলে বাস্তবে কী বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়।

কেন এখনো সন্দেহ কাটছে না?
কূটনৈতিক মহলের মতে, আলোচনায় অগ্রগতি হলেও চুক্তিটি এখনও অত্যন্ত ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ইউরেনিয়াম মজুতের ভবিষ্যৎ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো এবং লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাত, এসব বিষয়ে এখনও গুরুত্বপূর্ণ মতপার্থক্য রয়েছে।

এ ছাড়া চুক্তি কোথায় স্বাক্ষর হবে, কবে হবে এবং যৌথ ঘোষণার ভাষা কী হবে, এসব বিষয়ও এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

ফলে একদিকে ট্রাম্প প্রশাসন দ্রুত সাফল্যের বার্তা দিচ্ছে, অন্যদিকে ইরান সতর্ক অবস্থান বজায় রাখছে। এই বিপরীতমুখী বার্তাই ইঙ্গিত দিচ্ছে, সম্ভাব্য সমঝোতা হয়তো আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে কাছাকাছি, কিন্তু সেটি এখনো নিশ্চিত বাস্তবতায় পরিণত হয়নি।

তাই আপাতত বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি নিয়ে কূটনৈতিক আশাবাদ যেমন রয়েছে, তেমনি শেষ মুহূর্তে জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *