বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬

সবশেষ

শরীয়তপুরের এক গ্রাম, যেখানে ভবিষ্যতের নাম ‘ইতালি’

শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার নালতা গ্রামে ঢুকলেই চোখে পড়ে এক ভিন্ন বাস্তবতা। গ্রামের সাধারণ পরিবেশের মধ্যে হঠাৎ করেই দেখা মেলে দৃষ্টিনন্দন বহুতল ভবন, আধুনিক নকশার বাড়ি, টাইলস বসানো আঙিনা আর কাচঘেরা বারান্দা। এসব স্থাপনার পেছনে রয়েছে একটি দেশের নাম, ইতালি।

স্থানীয়দের কাছে নালতা এখন ‘ইতালি গ্রাম’ হিসেবেই বেশি পরিচিত। কারণ, চার দশকেরও বেশি সময় ধরে এই গ্রামের অসংখ্য মানুষ জীবিকার সন্ধানে ইতালিতে পাড়ি জমিয়েছেন। বর্তমানে এমন পরিবার খুঁজে পাওয়া কঠিন, যাদের কোনো সদস্য বা নিকটাত্মীয় ইতালিতে নেই।

গ্রামের প্রবীণ কৃষক ফারাজ আলী ঢালী জানান, নালতার প্রায় ৯০ শতাংশ পরিবারের সঙ্গে ইতালির কোনো না কোনো সম্পর্ক রয়েছে। এ কারণেই গ্রামটির এমন পরিচিতি গড়ে উঠেছে। এই অভিবাসনপ্রবণতার সূচনা আশির দশকে। তখন ঘন ঘন বন্যা ও নদীভাঙনে নড়িয়ার বহু মানুষ ঘরবাড়ি ও জীবিকা হারান। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তির পথ খুঁজতে অনেকেই বিদেশমুখী হন। তাদের মধ্যে একটি বড় অংশের গন্তব্য ছিল ইতালি।

স্থানীয় সাংবাদিক মাহবুব আলম বলেন, ১৯৮৮, ১৯৯৮ ও ২০০৪ সালের ভয়াবহ বন্যা এলাকার মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে দেয়। কৃষিনির্ভর ও শ্রমজীবী বহু পরিবার তখন নতুন সম্ভাবনার খোঁজে বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ইতালিতে যাওয়া অনেকের জীবনই পরে বদলে দেয়।

নালতার সেই প্রথমদিকের প্রবাসীদের একজন ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলী। তিনি জানান, তার মামা মতিউর রহমান ভুলু আশির দশকের শুরুতে ইতালিতে যান। পরে তার সহায়তায় ১৯৮৫ সালে তিনিও সেখানে পাড়ি জমান। পড়াশোনার পাশাপাশি ব্যবসায় যুক্ত হয়ে তিনি একটি রেস্তোরাঁ প্রতিষ্ঠা করেন।

তার ভাষ্য, সে সময় অনেকেই অনিয়মিত পথে ইতালিতে গেলেও পরবর্তীতে তাদের অর্থনৈতিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়। ১৯৮৭ সালে ইতালি সরকার নথিপত্রহীন বহু বাংলাদেশিকে বৈধতার সুযোগ দেয়। পরে নব্বইয়ের দশকে স্পনসর ভিসা চালু হলে নড়িয়ার মানুষের জন্য ইউরোপে যাওয়ার পথ আরও সহজ হয়ে ওঠে।

ইতালিতে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশিরা তখন আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের ভিসা, চাকরি এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহে সহায়তা করতে শুরু করেন। ফলে অভিবাসনের একটি ধারাবাহিক চক্র তৈরি হয়। এই প্রবাসী আয়ের প্রভাব সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান নালতার অবকাঠামোয়। রেমিট্যান্সের অর্থে অনেক পরিবার জমি কিনেছে, আধুনিক বাড়ি নির্মাণ করেছে। কেউ কেউ শরীয়তপুরের পাশাপাশি রাজধানী ঢাকাতেও সম্পদের মালিক হয়েছেন।

ফারাজ আলীর মতে, আগে যারা ইতালিতে গিয়েছিলেন, তারা তুলনামূলকভাবে বেশি সুযোগ পেয়েছেন। বর্তমানে অনেক বাংলাদেশি রোম, মিলান ও ভেনিসসহ বিভিন্ন শহরে হোটেল ও রেস্তোরাঁ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। পরিশ্রমী ও আইন মেনে চলার কারণে ইতালিতে বাংলাদেশিদের একটি ইতিবাচক ভাবমূর্তিও তৈরি হয়েছে।

তবে সময়ের সঙ্গে ইতালিতে যাওয়া শুধু কর্মসংস্থানের বিষয় হয়ে থাকেনি; এটি অনেকের কাছে সামাজিক মর্যাদার প্রতীকেও পরিণত হয়েছে। গ্রামের শিশু-কিশোররা ছোটবেলা থেকেই ইউরোপের গল্প শুনে বড় হয়। ছুটিতে দেশে ফেরা প্রবাসীদের জীবনযাপন তাদের কল্পনায় নতুন স্বপ্নের জন্ম দেয়।

পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী স্বাধীন সরদারের স্বপ্নও তাই ইতালিকেন্দ্রিক। তার বাবা এক দশক আগে লিবিয়া হয়ে ইতালিতে গেছেন এবং সেখানে রাঁধুনির কাজ করেন। স্বাধীন জানায়, তার অধিকাংশ সহপাঠীও বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে; ডাক্তার, প্রকৌশলী বা শিক্ষক হওয়ার আকাঙ্ক্ষা তুলনামূলকভাবে কম।

তবে এই প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে। ফারাজ আলীর মতে, বিদেশে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা অনেক শিক্ষার্থীর পড়াশোনার আগ্রহ কমিয়ে দিচ্ছে। অনেকেই মনে করে, ইতালিতে পৌঁছাতে পারলেই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত; উচ্চশিক্ষা ততটা জরুরি নয়।

অন্যদিকে, বর্তমানে ইতালিতে বৈধভাবে অভিবাসন আগের তুলনায় অনেক বেশি ব্যয়বহুল ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ। কর্মসংস্থানের চেয়ে ভিসাপ্রত্যাশীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় অনেকেই ঝুঁকিপূর্ণ অবৈধ পথ বেছে নিচ্ছেন।

বিশেষ করে লিবিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার পথে মানবপাচারকারী চক্র ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর কবলে পড়ার ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। অনেককে বন্দিশিবিরে আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায়ের জন্য নির্যাতন করা হয়।

মোহাম্মদ আলীর মতে, এই ঝুঁকিপূর্ণ পথ শুধু মানুষের জীবনকেই বিপন্ন করছে না, বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তিনি বলেন, ইতালির শ্রমবাজারে এখন সুযোগ সীমিত। তাই অবৈধ পথে সেখানে যাওয়ার চেষ্টা কোনোভাবেই যুক্তিসংগত নয়। তার সতর্কবার্তা, লিবিয়া হয়ে ইতালির পথে যাত্রা বহু মানুষের জন্য মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। উন্নত জীবনের আশায় কেউ যেন এমন বিপজ্জনক পথ বেছে না নেয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *