রবিবার, ২১ জুন ২০২৬

সবশেষ

হরমুজ ঘিরে উত্তেজনা, সুইজারল্যান্ডে মুখোমুখি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান: শান্তি প্রক্রিয়ার সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই নতুন করে আলোচনার টেবিলে বসতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। সুইজারল্যান্ডে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের প্রস্তুতি চলার সময় ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার দাবি করেছে। তবে ওয়াশিংটন এই দাবিকে সরাসরি অস্বীকার করে জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক এই নৌপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এমন পরস্পরবিরোধী অবস্থান চলমান শান্তি প্রচেষ্টার ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

সুইজারল্যান্ডে শুরু হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, শান্তি আলোচনায় অংশ নিতে দেশটির উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল ইতোমধ্যে সুইজারল্যান্ডে পৌঁছেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও ওয়াশিংটন ত্যাগ করেছেন।

মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান জানিয়েছে, রোববার থেকেই আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

এর আগে, উভয় দেশ ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখতে সম্মত হয়েছিল। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পরপরই লেবাননে ইসরায়েলি হামলা পরিস্থিতিকে নতুন মোড় দেয়।

হরমুজ প্রণালি নিয়ে দুই পক্ষের বিপরীত বক্তব্য
লেবাননে চলমান ইসরায়েলি অভিযানের প্রতিক্রিয়ায় আইআরজিসি ঘোষণা দেয় যে, তারা কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে।

বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান রুট হিসেবে পরিচিত এই প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবহন করা হয়। ফলে এমন ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক বাজারে উদ্বেগ দেখা দেয়।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, বাস্তবে পরিস্থিতি ভিন্ন। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, শনিবার অন্তত ৫৫টি বাণিজ্যিক জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। এসব জাহাজে বিশ্ববাজারের জন্য ১ কোটি ৭০ লাখ ব্যারেলেরও বেশি তেল বহন করা হচ্ছে।

সেন্টকমের বক্তব্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন নির্বিঘ্ন রাখতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী সক্রিয় রয়েছে।

যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা
বর্তমান আলোচনার মূল লক্ষ্য হলো পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় সম্পাদিত ইরান-যুক্তরাষ্ট্র অন্তর্বর্তী চুক্তিকে আরও এগিয়ে নেওয়া।

গত বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ওই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। প্রায় চার মাস ধরে চলা সংঘাতের অবসান ঘটানোই ছিল এর প্রধান উদ্দেশ্য।

তবে লেবাননের পরিস্থিতি নতুন করে জটিলতা সৃষ্টি করেছে। আইআরজিসি অভিযোগ করেছে, ইসরায়েলের হামলা যুদ্ধবিরতির চেতনার পরিপন্থী। একই সঙ্গে তারা সতর্ক করে বলেছে, হরমুজ প্রণালির আশপাশে চলাচলকারী জাহাজগুলো ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।

ট্রাম্পের টোল সংক্রান্ত মন্তব্য
হরমুজ প্রণালি নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও নতুন মন্তব্য করেছেন।

তিনি বলেছেন, ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি চলাকালীন এবং পরবর্তী সময়েও প্রণালিটি ব্যবহারকারী জাহাজের কাছ থেকে কোনো টোল বা অতিরিক্ত ফি নেওয়া হবে না।

তবে আলোচনায় অগ্রগতি না হলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি পরিবর্তিত হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প উল্লেখ করেন, মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র যে ভূমিকা পালন করছে, শান্তি উদ্যোগ ব্যর্থ হলে তার বিনিময়ে টোল আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে।

ইরানের অভিযোগ: চুক্তির শর্ত বাস্তবায়নে ব্যর্থ যুক্তরাষ্ট্র
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির উপদেষ্টা মোহাম্মদ মোখবার অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ১৪ দফা অন্তর্বর্তী চুক্তির প্রথম শর্তই বাস্তবায়ন করতে পারেনি।

তার দাবি, ওই শর্ত অনুযায়ী লেবাননসহ সব সংঘাতপূর্ণ ফ্রন্টে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার কথা ছিল।

মোখবার বলেন, যদি চুক্তি শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকে এবং বাস্তবায়ন না হয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল ও গ্যাস সরবরাহও স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে না।

লেবাননে যুদ্ধবিরতি নিয়েও অনিশ্চয়তা
এদিকে লেবাননে ঘোষিত যুদ্ধবিরতিও টেকসই হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

লেবাননের ‘লেবানিজ সিভিল ডিফেন্স’ জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইসরায়েলি হামলায় ২০ জন নিহত হয়েছেন।

ইসরায়েলের দাবি, তারা হিজবুল্লাহর হামলার জবাব দিয়েছে। অন্যদিকে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ বলেছে, তারা লেবাননে ইসরায়েলের জন্য কোনো ধরনের ‘অবাধ চলাচল’ নিশ্চিত করবে না।

লেবানন থেকে সেনা সরাচ্ছে না ইসরায়েল
ইসরায়েল পরিষ্কারভাবে জানিয়েছে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে হওয়া চুক্তির অংশ তারা নয়। ফলে বর্তমানে লেবাননের যেসব এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, সেখান থেকে সেনা প্রত্যাহারের কোনো পরিকল্পনা নেই।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তারা যুদ্ধবিরতির প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে ইসরায়েল কিংবা তাদের সেনাদের প্রতি যেকোনো হুমকির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া অব্যাহত থাকবে।

দেশটির সংবাদমাধ্যম চ্যানেল টুয়েলভ জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী সেনাবাহিনীকে নতুন করে গোলাগুলি না চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন। তবে যে এলাকাগুলো বর্তমানে তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, সেখান থেকে আপাতত সেনা সরানো হবে না।

আলোচনায় কারা থাকছেন
সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিতব্য বৈঠকে ইরানি প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। তার সঙ্গে রয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং নিরাপত্তা, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও জ্বালানি খাতের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

অন্যদিকে মার্কিন প্রতিনিধিদলে রয়েছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনার।

মেরিল্যান্ডের জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজ থেকে সুইজারল্যান্ডের উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে সাংবাদিকদের ভ্যান্স বলেন, আলোচনা কয়েক দিন পর্যন্ত চলতে পারে।

তার ভাষায়, পারমাণবিক কর্মসূচি সংক্রান্ত ইস্যু এবং লেবাননের যুদ্ধবিরতি, দুই ক্ষেত্রেই অগ্রগতির সম্ভাবনা রয়েছে।

পাকিস্তানের সক্রিয় ভূমিকা
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, অতীতে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার ইরান আলোচনায় বাস্তবায়নযোগ্য নিশ্চয়তার ওপর গুরুত্ব দেবে।

অন্যদিকে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সপ্তাহান্তের বৈঠকগুলোতে দেশটির প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং সেনাপ্রধান আসিম মুনিরও অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংকট, হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা এবং লেবাননের অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্যে সুইজারল্যান্ডের এই বৈঠককে অনেকেই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *